নড়াইল কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি নড়াইল জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।
তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা নড়াইল জেলার সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
নড়াইল জেলার ইতিহাস?
পাকিস্তান সৃষ্টির সময় নড়াইল মহাকুমায় মোট চারটি থানা ছিল ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে আলফাডাঙ্গা থানা যশোর হতে ফরিদপুর জেলায় ভুক্ত হয়। এরপর ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ নড়াইল মহকুমার প্রশাসক জনাব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর নেতৃত্বে অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ, জনাব আব্দুল হাইসহ আরও অনেকের সহযোগিতায় নড়াইল ট্রেজারীর তালা ভেঙ্গে অস্ত্র নিয়ে যশোর সেনানিবাস আক্রমণের মাধ্যমে এ জেলার মানুষের মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়।
অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার রক্ত এবং অগণিত অত্যাচারিত, লাঞ্চিত মা-বোনদের অশ্রু ও সংগ্রামের ফলে ১৯৭১ সনের ১০ ডিসেম্বর নড়াইল হানাদার মুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ নড়াইল মহাকুমাকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় রুপান্তরিত করা হয়।
নড়াইল জেলার ভৌগোলিক অবস্থান?
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে নড়াইল জেলা অন্যতম। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি জেলা হচ্ছে নড়াইল। নড়াইল জেলার উত্তরে মাগুরা জেলা, দক্ষিণে বাগেরহাট জেলা, পূর্বে গোপালগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে যশোর জেলা অবস্থিত। নড়াইল জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৯৯০.২৩ বর্গ কিলোমিটার।
আরও পড়ুনঃ হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস | হবিগঞ্জ কিসের জন্য বিখ্যাত
নড়াইল জেলার নামকরণ?
নড়াইল জেলার নামকরণ নিয়ে দু’টি মতবাদ রয়েছে। প্রথম তথ্য সূত্রে, নড়াইল শব্দটি নড়াই শব্দ থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ নড়াচড়া অথবা চলাচল। এটি একটি নদী কিংবা জলাশয়ের নাম হতে পারে।
যেখানে নৌকা কিংবা অন্য কোন পরিবহণের মাধ্যমে চলাচল করত। আরেকটি মতবাদ অনুযায়ী নড়াইল নামটি নড়াই বা নড়াল শব্দের পরিবর্তিত রূপ হতে পারে। যার অর্থ হলো চলন্ত বা গমনকারী, যা এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি বা নদীগুলোর বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে।
নড়াইল জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
নড়াইল জেলা খেজুরের রস, খেজুরের গুড় ও পেড়ো সন্দেশ এর জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও জেলায় বেশ কিছু বিখ্যাত ব্যক্তি এবং দর্শনীয় স্থান রয়েছে। যেগুলো নড়াইল জেলাকে বিখ্যাত করতে ভূমিকা পালন করে। তাই আসুন আমরা আগে নড়াইলের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জেনে আসি।
নড়াইল জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?
শপনোবিথি পিকনিক স্পট
এটি সাঁতার, বোটিং এবং পিকনিক করার জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান। এই পিকনিক স্পটি নড়াইল এর চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত।
এস এম সুলতান জাদুঘর
এই জাদুঘরটি একজন বিখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতানের জীবন ও কর্মের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। জাদুঘরটিতে সুলতানের চিত্রকর্ম ও বিভিন্ন ভাস্কর্যসহ শিল্পকর্মের সংগ্রহ রয়েছে।
বান্ধা ঘাট
পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই ঘাটটি নৌকায় চড়া ও মাছ ধরার জন্য পরিচিত। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আপনারা অবসর সময় কাঠাতে পারবেন।
নূর মোহাম্মদ কমপ্লেক্স
এই কমপ্লেক্সে সুন্দর স্থাপত্যের নূর মোহাম্মদ মসজিদ, নূর মোহাম্মদ সমাধি এবং নূর মোহাম্মদ হাউস সহ অনেক ঐতিহাসিক ভবন রয়েছে।
অরুণিমা রিসোর্ট গল্ফ ক্লাব
এই বিখ্যাত রিসোর্টটি চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে বসে আপনারা আশেপাশের গ্রামাঞ্চলের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখাতে পারবেন।
আরও পড়ুনঃ কিশোরগঞ্জ জেলার ইতিহাস | কিশোরগঞ্জ কিসের জন্য বিখ্যাত
নড়াইল জেলার বিখ্যাত খাবার?
পেড়ো সন্দেশ
দুধের ক্ষীর দিয়ে তৈরি এই মিষ্টান্নটি নড়াইলের একটি জনপ্রিয় খাবার। নড়াইলের শহর কিংবা গ্রাম সবখানে এই পেড়ো সন্দেশ বেশ জনপ্রিয়।
খেজুরের রস ও গুঁড়
শীতকালে আসলেই নড়াইলে খেজুরের রস ও গুঁড় তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। নড়াইলে খেজুরের রস ও গুঁড় দিয়ে পায়েস, পিঠা এবং বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি তৈরি করা হয়।
ভাজা পিঠা ও দুধ চিতই
নড়াইলে আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হচ্ছে ভাজা পিঠা ও দুধ চিতই পিঠার। এটি খেজুরের রস বা গুঁড়ের সাথে খাওয়া হয়ে থাকে।
ছানার জিলাপি
মিষ্টি জাতীয় খাবারের মধ্যে ছানার জিলাপি অন্যতম। এটি ছানা, চিনি, ঘি এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয়। যা খেতে মুচমুচে এবং অনেক সুস্বাদু হয়ে থাকে।
চমচম
নড়াইলের আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হচ্ছে চমচম। নড়াইলের এই সুস্বাদু চমচম তৈরি হয় দুধ থেকে। যা প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে ছানা তৈরি করে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়।
নড়াইল জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক এবং নড়াইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। যিনি নড়াইলের কৃতি সন্তান হিসেবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম।
নূর মোহাম্মদ শেখ
নূর মোহাম্মদ শেখ ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য নূর মোহাম্মদ শেখ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
বিজয় সরকার
বিজয় সরকার একজন বাংলাদেশী চারণ কবি ও গায়ক ছিলেন। তিনি ১৯০৩ সালে নড়াইলে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ১৯৮৫ সালে ভারতের পশ্চিমে মৃত্যুবরণ করেন।
মাসরুর উল হক সিদ্দিকী
তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অসীম সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন।
নিহাররঞ্জন গুপ্ত
তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি ৬ জুন ১৯১১ সালে নড়াইলে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
আরও পড়ুনঃ নেত্রকোনা জেলার ইতিহাস | নেত্রকোনা কিসের জন্য বিখ্যাত
নড়াইল জেলার আয়তন কত?
নড়াইল জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৯৯০.২৩ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৭,৮৮,৬৭৩ জন।
নড়াইল জেলার উপজেলা কয়টি?
নড়াইল জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ৩টি। যেমনঃ
- নড়াইল সদর
- লোহাগড়া
- কালিয়া
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।
এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে মেহেরপুর কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
নড়াইল জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানেই বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ



