ফরিদপুর কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি ফরিদপুর জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন। তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন।
কেননা এই আর্টিকেলে আমরা ফরিদপুর জেলার সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
ফরিদপুর জেলার ইতিহাস?
আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পারছি যে, ফরিদপুর একটি সু-বিকশিত নগর কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি ছিল। শহরে গুরুত্বপূর্ণ মুঘল সরকারি কর্মকর্তারা যেমনঃ জেনারেল, বেসামরিক কর্মচারী এবং জায়গিরদারদের বসবাস ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসন আমলে, সতেরো শতকে, স্থানীয় জমিদার সত্রাজিত ও মুকুন্দ মুঘল সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
এরপর উনিশ শতকে আজমীর চিশতিয়া তরিকার অনুসারী সুফি সাধক শাহ ফরিদ উদ্দিন মাসুদের সম্মানে শহরটির নামকরণ করা হয় ফরিদপুর। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে হাজী শরীয়তুল্লাহ এবং দুদু মিয়া ফরিদপুরে রক্ষণশীল ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশরা ফরিদপুর জেলা প্রতিষ্ঠা করেন।
ফরিদপুর জেলার ভৌগোলিক অবস্থান?
ফরিদপুর জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলে ঢাকা বিভাগের একটি অন্যতম প্রশাসনিক অঞ্চল। বাংলাদেশের ৪র্থ তম বৃহত্তম পৌরসভা ও দেশের ১৪তম বৃহত্তম শহর হচ্ছে ফরিদপুর। ফরিদপুর জেলার পূর্বে ঢাকা, মাদারীপুর ও মুন্সীগঞ্জ, পশ্চিমে মাগুরা ও নড়াইল, উত্তরে রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ জেলা এবং দক্ষিণে গোপালগঞ্জ জেলা অবস্থিত। ফরিদপুর জেলার হচ্ছে আয়তন ২০৭২.৭২ বর্গ কিলোমিটার।
ফরিদপুর জেলার নামকরণ?
ফরিদপুর জেলার আদিনাম ছিল ফতেহাবাদ। ততকালীন প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ শেখ ফরিদুদ্দিনের নামানুসারে নামকরণ করা হয় ফরিদপুর। তবে ১৭৮৬ সালে ফরিদপুর জেলার প্রতিষ্ঠা হলেও তখনও এটির নাম ছিল জালালপুর। পরে ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা জালালপুর হতে বিভক্ত হয়ে এটি ফরিদপুর জেলা নামে আখ্যাত বা ঘোষণা করা হয়।
ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
ফরিদপুর জেলা বিখ্যাত হওয়ার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে এ জেলাকে বিখ্যাত করেছে খেজুরের গুড়। এছাড়াও ফরিদপুর জেলা বিভিন্ন ধরণের পিঠার জন্য বিখ্যাত। তবে শুরুতে আমরা এজেলার কিছু বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জেনে নিবো। যেসব দর্শনীয় স্থান জেলার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে। তাহলে চলুন শুরু করা যাক।
ফরিদপুর জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?
ধলার মোড় (পদ্মার পাড়)
ফরিদপুর জেলা শহরের মানুষের অন্যতম একটি বিনোদন স্পট হচ্ছে ধলার মোড় বা পদ্মার পাড়। এখানে শুধু ফরিদপুর জেলার মানুষ ঘুরতে আসে এমনটা নয়। এখানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ প্রতিদিন ঘুরতে আসে।
নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট
এই নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রথমে ঢাকায় ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর এটি ১৯৮৯ সালের ১লা জুলাই ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলায় স্থানান্তর করা হয়। এটি বাংলাদেশের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র।
পল্লি কবি জসীমউদ্দীনের বাসভবন
পল্লী কবি জসীম উদ্দীন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাড়িতে ৪টি পুরাতন টিনের ঘর রয়েছে। এই ঘর গুলোর বিভিন্ন রুমে তার ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র রয়েছে।
শেখ রাসেল শিশু পার্ক
ফরিদপুর জেলা শহরের গোয়ালচামট নামক স্থান ১৪ একর জমির উপর নির্মিত এই শেখ রাসেল শিশু পার্ক। এখানে ঘরতে আসলে আপনারা দেখতে পাবেন। যেমনঃ ভূতরে গুহা, ওয়ান্ডার হুইণ, সুইং কেয়ার, প্যারাট্যপার, বোট রাইডিং ইত্যাদি।
মীরগঞ্জ নীল কুঠি
মীরগঞ্জ নীল কুঠি ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার ফলিয়া গ্রামে অবস্থিত। এটি ফরিদপুর জেলার নীল চাষের প্রধান কার্যালয়ম
ফরিদপুর জেলার বিখ্যাত খাবার?
খেজুরের গুড়
ফরিদপুর জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হচ্ছে খেজুরের গুড়। এই গুড় মূলত খেজুরের সর দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এবং এগুলো নামও আলাদা আলাদা রাখা হয়। যেমনঃ ঝোলা গুড়, পাটালি, দানা গুড়, চিটাগুড় ইত্যাদি।
ইলিশ
ফরিদপুর জেলার আরেকটি জনপ্রিয় খাবার হচ্ছে ইলিশ। ফুরিদপুর জেলার পদ্মা নদী থেকে ধরা এই ইলিশ অত্যন্ত সুস্বাদু হয়ে থাকে। ফরিদপুর শহরে গেলে আপনারা ইলিশের ঝোল, ইলিশ ভাপা, ইলিশ ভাঁজ ইত্যাদি পদের খাবার খেতে পারবেন।
পিঠা
শীত আসলেই ফরিদপুর জেলায় নানান ধরণের পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়। এখানকার পিঠা অনেক সুস্বাদু হয়ে থাকে। বাঙালির পিঠা উৎসব ধরে রাখতে প্রতিবছর ফরিদপুরে আয়োজন করা হয় পিঠা উৎসব মেলা। তাহলে বুঝতেই তো পারছেন এখানকার পিঠা কতটা জনপ্রিয়।
আমের আচার
ফরিদপুর জেলার জনপ্রিয় একটি খাবার হচ্ছে টক মসলাদার যুক্ত আমের আচার। এ জেলায় আমের মৌসুম আসলেই এই আচার তৈরির ধুম পড়ে যায়। আহ্ কি যে স্বাদ, এই আমের আচারের, ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।
পায়েস
ফরিদপুর জেলার আরেকটি বিখ্যাত খাবার হচ্ছে পায়েস। এই পায়েস এখানকার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। এ জেলায় বিয়ে অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সব ধরণের উৎসবে এই পায়েস পরিবেশ করা হয়। এটি এখন ফরিদপুরের একটি ট্রেডিশনাল খাবার হয়ে দাড়িয়েছে।
ফরিদপুর জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
আবদুল খালেক
তিনি অবিভক্ত ভারতবর্ষের কংগ্রেস নেতা, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন।
শামসুল হক ফরিদপুরী
তিনি বাংলাদেশী ইসলামি চিন্তাবিদ, প্রখ্যাত আলেম এবং সমাজ সংস্কার ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় নেতা।
এম এ হক
তিনি একজন বাংলাদেশী কবি গীতিকার, প্রাবন্ধিক, ছড়াকার এবং গল্পকার ছিলেন। তিনি ১ জানুয়ারি ১৯২৯ সালে ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। এবং তার বয়স যখন ছিলো ৭৭, অর্থাৎ ১৩ আগস্ট ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
জসীম উদ্দিন
তিনি একজন বাঙালি কবি, গীতিকার, ঔপন্যাসিক এবং লেখক ছিলেন। তিনি ১ জানুয়ারি ১৯০৩ সালে ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। এবং ১৪ মার্চ ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
কাজী মোতাহার হোসেন
কাজী মোতাহার হোসেন একজন বাংলাদেশি পরিসংখ্যানবিদ ও বিখ্যাত সাহিত্যিক। তিনি ৩০ জুলাই ১৮৯৭ সালে কুমারখালি কুষ্টিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ৯ অক্টোবর ১৯৮১ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
ফরিদপুর জেলার আয়তন কত?
ফরিদপুর জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ২,০৭২.৭২ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ২১,৬২,৮৭৯ জন।
ফরিদপুর জেলার উপজেলা কয়টি?
ফরিদপুর জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ৯টি। যেমনঃ
- ফরিদপুর সদর
- সালথা
- ভাঙ্গা
- সদরপুর
- বোয়ালমারী
- আলফাডাঙ্গা
- মধুখালি
- নগরকান্দা
- চরভদ্রাসন
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে। এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে।
এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে মাদারীপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন। ফরিদপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন।
আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানেই বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ



