সিঙ্গাপুর এশিয়া মহাদেশের একটি উন্নত দেশ। তাছাড়া বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম। এখানে চিকিৎসা, বাসস্থান পরিবহন ও কর্মপরিবেশ অনেকটা উন্নত ও সুশৃংখল।
তাছাড়া সিঙ্গাপুর সরকার প্রবাসীদের জন্য বৈধ লিগ্যাল ওয়ার্ক পারমিট ও S pass দিয়ে থাকে যার কারণে অনেকেই সিঙ্গাপুরে যান। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে এজেন্সির মাধ্যমে খুব সহজেই যাওয়া যায়।
এই পোস্টে আলোচনা করা হবে সিঙ্গাপুর ভিসা কিভাবে পাবেন, সিঙ্গাপুর ভিসা পেতে কত টাকা লাগে ও সিঙ্গাপুরে কাজের বেতন কত এই সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য। তাহলে চলুন দেরি না করে জেনে নেওয়া যাকঃ
সিঙ্গাপুর কাজের ভিসা পাওয়ার উপায়?
সিঙ্গাপুর সরকার বাইরে থেকে যারা সিঙ্গাপুরের কাজ করতে যেতে চাই তাদের জন্য বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা তৈরি করে দিয়েছে।
সিঙ্গাপুরে যাওয়ার জন্য কয়েক ধরনের ভিসা পাওয়া যায়। নিম্নে এই ভিসার ক্যাটাগরী গুলো সম্পর্কে জানানো হলোঃ
১. Work Permit (Wp) বা ননস্কিল ভিসা
সাধারণত এই ভিসা দেওয়া হয়ে থাকে যারা কম দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিক তাদেরকে। এরা সাধারণত কন্সট্রাকশন, ম্যানুফ্যাকচারিং, ক্লিনার ও ডোমেস্টিক হেল্পার সহ আরো কিছু কাজ করে থাকেন।
এই ধরনের কাজে যারা চান তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগেনা তবে ফিটনেস ভালো থাকতে হয় এবং বয়স একটু কম হতে হয় । এই ভিসায় যারা কাজ করে থাকেন তাদের বেতন ৬০ হাজার টাকা থেকে ৭০ হাজার টাকার উপরে হতে পারে।
২. S pass (মধ্যম দক্ষতা সম্পন্ন কর্মীদের জন্য)
সিঙ্গাপুরের কাজের ভিসায় যারা যেতে চান তারা এই বিষয়টিও নিতে পারেন যদি টেকনিশিয়ান, সুপারভাইজার, মেশিন অপারেটর, রেস্টুরেন্ট স্টাফ এইসব কাজের উপর দক্ষতা থাকে। তবে এই কাজে যেতে হলে অবশ্যই শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে।
অনেকের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা থাকা লাগে ও ইংরেজি কিছুটা জানা লাগে। যারা এই ধরনের কাজ করে থাকেন তারা মানুষের ২ লাখ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বেতন পেয়ে থাকেন।
৩. Employment Pass (EP) (পেশাদার ও উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তি
যারা পেশাদার ও উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তি তাদের জন্য সিঙ্গাপুর সরকার এই ভিসার ব্যবস্থা করেছে। এই ভিসার মাধ্যমে শুধুমাত্র তারাই যেতে পারবে – আইটি এক্সপার্ট, ইঞ্জিনিয়ার, একাউন্টেন্ট ও ডাক্তার সহ নির্দিষ্ট পেশার কিছু লোক।
তবে এই ধরনের ভিসা পাওয়াটা অনেক কঠিন একটি ব্যাপার। এই ভিসা পেতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী থাকতে হবে, কাজের ভালো অভিজ্ঞতা থাকতে হবে
ও সিঙ্গাপুরের কোন কোম্পানি থেকে অফার লেটার পেতে হবে। এরা প্রতিমাসে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকার মত বেতন পেয়ে থাকেন।
৪. Miscellaneous Work Pass
অস্থায়ী কাজের জন্য অনেক সময় এই ধরনের ভিসা দেওয়া হয়ে থাকে। অর্থাৎ কিছুদিনের জন্য সিঙ্গাপুরে গিয়ে কাজ করে আবার বাংলাদেশ চলে আসতে পারবেন।
সেমিনার ইভেন্ট ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাজের জন্য এই ধরনের ভিসা কয়েকদিনের জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। এরা সাধারণত কাজের ধরন অনুযায়ী স্বল্প মেয়াদী বেতন পেয়ে থাকেন।
তাহলে ইতিমধ্যে চার ধরনের ভিসা সম্পর্কে জেনে গিয়েছেন। এবার আপনাকে সিলেক্ট করতে হবে যে আপনি কোন ভিসার মাধ্যমে সিঙ্গাপুর যেতে চান।
সিঙ্গাপুরের কাজের ভিসা পাওয়ার জন্য কি কি শর্তাদি পূরণ করা লাগে তার একটি বেসিক ধারণা দেওয়া হলো।
সিঙ্গাপুর কাজের ভিসা পেতে কি কি কাগজপত্র লাগে?
যে ভিসার মাধ্যমেই আপনি সিঙ্গাপুর যান না কেন কাগজপত্র বা ডকুমেন্ট অবশ্যই লাগবে। নিম্নে সিঙ্গাপুর কাজের ভিসা পেতে কি কি ডকুমেন্ট লাগে তা উল্লেখ করা হলোঃ
- সিঙ্গাপুর কাজের ভিসা পেতে হলে অবশ্যই একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকা লাগবে।
- পাসপোর্টে অবশ্যই ছয় মাসের বেশি মেয়াদ থাকতে হবে।
- জন্ম নিবন্ধন সনদ বা এনআইডি কার্ডের ফটোকপি লাগবে।
- দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড ছবি লাগবে।
- যদি উচ্চতা সম্পন্ন ব্যক্তি হয়ে থাকেন তাহলে চাকরির অফার লেটার লাগবে।
- মেডিকেল রিপোর্ট প্রয়োজন হবে।
আপাতত এই ডকুমেন্টগুলো হলেই হয় তবে এজেন্সি বা দূতাবাসের মাধ্যমে যদি বাড়তি কোন ডকুমেন্ট চাই তাহলে দিতে পারেন।
কেননা নিয়ম নীতি মাঝেমধ্যেই আপডেট হয়ে থাকে তাই অবশ্যই সব শর্তাদি মেনেই ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।
সিঙ্গাপুরে কোন কাজের চাহিদা বেশি?
সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে অবশ্যই আপনাদেরকে সিঙ্গাপুরে কোন কাজের চাহিদা বেশি এটা সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। বাংলাদেশী শ্রমিক যারা সিঙ্গাপুরে যায় তারা অনেকেই নির্মাণ খাতে বেশি কাজ করে থাকেন।
কনস্ট্রাকশন, প্লাম্বিং, ওয়েলডিং এই ধরনের কাজগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সিঙ্গাপুরে। তাছাড়া অনেকেই পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করে থাকেন নন স্কিল ভিসায় গিয়ে। তাছাড়া মেরিন ও শিপইয়ার্ড খাতে বাংলাদেশী কর্মীদের চাহিদা রয়েছে।
অনেক বাংলাদেশী কর্মীকে ম্যানুফ্যাকচারিং ও প্যাকেজিং কাজে দেখা যায়। এখানে তারা মূলত প্যাকেজিং, ক্লিনিং, কারখানা ও ফ্যাসিলিটি সার্ভিসের কাজ করে থাকেন। তাছাড়া অনেককে দেখা যায় হাউজ কিপিং এর কাজ করতে।
সম্প্রতি সময়ে আইটি খাতেও সিঙ্গাপুরে অনেক বাংলাদেশীরা চাকরি করছে। তাছাড়া হোটেল রেস্টুরেন্টে কাজেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই এসব বিষয়গুলোতে যদি আপনার দক্ষতা থাকে তাহলে সিঙ্গাপুরে গিয়ে কাজের অভাব হবে না।
সিঙ্গাপুর কাজের বেতন?
সিঙ্গাপুরের যারা কাজের উদ্দেশ্যে যায় তাদের বেতনের পরিমাণটা নির্ভর করে সাধারণত তারা কোন সেক্টরে কাজ করছেন এর উপর। তাছাড়া অভিজ্ঞতা কত, কোম্পানির ধরন ও ওয়ার্ক পারমিটের উপর বেস করেও বেতন কমবেশি হয়ে থাকে।
সিঙ্গাপুরে যারা কনস্ট্রাকশনের কাজ করে থাকেন তারা প্রথম অবস্থায় সত্তর হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে অভিজ্ঞতা বাড়লে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়ে থাকে।
ক্লিনার ও জেনারেল হেলপার হিসেবে যারা কাজ করে থাকেন তারা প্রতি মাসে ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। রেস্টুরেন্ট ও হোটেল স্টাফ হিসেবে যারা কাজ করে থাকেন তাদের বোতল ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে যাবে।
তবে তাদের আরো অন্যান্য দিক থেকে আয় করার সুযোগ রয়েছে। যারা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে থাকেন তাদের বেতন ৯০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে অভিজ্ঞতা ও কাজের ধরন বুঝে।
সিঙ্গাপুরে ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বারের কাজ যারা করে থাকেন তাদের বেতন একটু বেশি হয়ে থাকে। তারা প্রতি মাসে দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকা বেতন পেয়ে থাকেন।
ওয়েল্ডার ফিটিং মিস্ত্রি এদের বেতন আরো বেশি। ওয়েল্ডার ফিটিং মিস্ত্রিরা প্রতিমাসে ২ লাখ টাকা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়ে থাকেন।
সিঙ্গাপুর কাজের ভিসা কত টাকা?
আমি আপনাদেরকে আগেই বলেছি যে সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্য কয়েক ধরনের কাজের ভিসা দেওয়া হয়। আপনি এখান থেকে কোন ভিসাটি সিলেক্ট করে সিঙ্গাপুর যেতে চান সেটি সর্বপ্রথম জানতে হবে।
অর্থাৎ খরচের বিষয়টা নির্ভর করে ভিসার ক্যাটাগরির উপর। যারা নন-স্কিল ভিসায় সিঙ্গাপুর যেতে চান তাদের সেখানে গিয়ে দুই বছর থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
ননস্কিল ভিসায় সিঙ্গাপুর যেতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে এজেন্টের মাধ্যমে গেলে। S Pass এই ওয়ার্ক পারমিট ভিসাটি মিলিয়ে যদি সিঙ্গাপুর কাজের উদ্দেশ্যে জান তাহলে খরচ আসবে ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা।
Employment Pass এই ভিসায় সিঙ্গাপুরে কাজে গেলে খরচের পরিমাণ অনেক কম হবে। কেননা এই ধরনের ভিসায় কোম্পানি এজেন্ট ফি বহন করে থাকে তাই খরচ অনেকাংশে কমে যায়।
আরও পড়ুনঃ ব্রুনাই ভিসার দাম কত | ব্রুনাই যেতে কত টাকা লাগে
বাংলাদেশে সিঙ্গাপুর ভিসা এজেন্টের লিস্ট?
সিঙ্গাপুরের ভিসা প্রক্রিয়া যদি আপনারা সহজভাবে করতে পারেন এজন্য বাংলাদেশের সিঙ্গাপুরের ভিসা এজেন্টদের কিছু লিস্ট দেওয়া হলো। আপনারা খুব সহজেই এখান থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন।
১. গুলশান টু ঢাকা (Bengal Travel & Tours Ltd)
ঠিকানা ল্যান্ড মার্ক বিল্ডিং চতুর্থ তলা
১২/১৪ গুলশান নর্থ সি, গুলশান ২ ঢাকা ১২১২
ফোন নাম্বার : +৮৮০২২২২২৮৬৬৩৪–৩৭, +৮৮০১৮১৯২১৫৯৮৩
২. ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল কর্পোরেশন লিমিটেড
ঠিকানা ল্যান্ডমার্ক বিল্ডিং ( দশম তলা)
১২/১৪ গুলশান নরথ সি / গুলশান ২ ঢাকা ১২১২
ফোন নাম্বার : +৮৮০২২২২২৬৪৪৪৫, +৮৮০২২২২২৯৮২৬১, +৮৮০১৭৬৬১৯৪৫০০
৩. গ্লোর এয়ার ট্রাভেলস
ঠিকানা: আনাননা প্রথমতলা ফ্লাট বি হাউস এক রোড ২৩, গুলশান ১ ঢাকা ১২১২
ফোন নাম্বার: +৮৮০২৮৮৩২৪২০, +৮৮০২৯৮৮৮৪৬২, +৮৮০১৮৪৭২১৫০০১–১০
৪. ইউনিয়ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেড
ঠিকানা ইউনিয়ন সেন্টার, পঞ্চম তলা ৬৮/১, গুলশান এভিনিউ, গুলশান ১ ঢাকা ১২১২
ফোন নাম্বার: : +৮৮০২২২২২৮৫৭৭১–২ (Ext-৫১০), +৮৮০১৭৫৫৬৪৩৯৪৯
উপরে যে ভিসা এজেন্টদের তালিকা প্রকাশ করলাম এগুলো আপনাকে সিঙ্গাপুর ভিসা পাওয়ার জন্য সাহায্য সহযোগিতা করবে। ভিসাগৃহীত হবে কিনা সেটা সিঙ্গাপুর হাই কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
সিঙ্গাপুর কাজের ভিসা প্রসেসিং হতে কতদিন সময় লেগে থাকে?
সিঙ্গাপুর নন স্কিল ভিসা প্রসেসিং হতে সাধারণত ৭ থেকে ১৪ কার্য দিবসের মতো সময় লেগে থাকে। S Pass ভিসা প্রসেসিং হতে সময় লেগে থাকে ১৪ থেকে ২১ কার্য দিবসের মতো EP ভিসা হাতে পেতে সর্বনিম্ন ৭ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
শেষ কথা
আশা করি ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুর কাজের হিসাব পাওয়ার পদ্ধতি ও সিঙ্গাপুর কাজের ভিসা পেতে কত টাকা লাগে এই বিষয়ে মোটামুটি ধারণা পেয়েছেন।
তারপরেও যদি সিঙ্গাপুর ভিসা সম্পর্কিত কোন ধরনের প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই কমেন্টের মাধ্যমে জানাবেন। ধন্যবাদ।



