নোয়াখালী কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি নোয়াখালী জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।
তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা নোয়াখালী জেলা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
নোয়াখালী জেলার ইতিহাস?
বর্তমান নোয়াখালী জেলা পূর্বে লক্ষ্মীপুর, ফেনী এবং নোয়াখালী জেলা নিয়ে একটি বৃহত্তর অঞ্চল ছিল। যা এখন বৃহত্তর নোয়াখালী নামে পরিচিত।
নোয়াখালী জেলা হিসাবে অঞ্চলটি মর্যাদা পায় মূলত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক এদেশে জেলা প্রশাসন প্রতিষ্ঠার সেই প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় থেকেই। এই নোয়াখালী জেলার প্রাচীন নাম ছিল ভুলুয়া।
এছাড়াও নোয়াখালী সদর থানার আদি নাম ছিল সুধারাম। ইতিহাসবিদদের মতে একবার ত্রিপুরার পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর জলে ভুলুয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় এবং বেশ কিছু ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় পেতে ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়। যা পানির প্রবল স্রোতকে ডাকাতিয়া নদী হতে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ি এবং চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে প্রবাহিত করে।
এই বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় নোয়া (নতুন) খাল বলা হত। মানে আমরা যেটাকে নতুন বলি সেটাকে নোয়াখালীর মানুষ নোয়া বলতো। এই ভাবেই এউ অঞ্চলটি একসময়ে লোকের মুখেমুখে পরিবর্তিত হয়ে নোয়াখালী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।
নোয়াখালী জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
এই প্রশ্নের উত্তর বাকি সব জেলার থেকে একটু আলাদা ধরণের। বুঝিয়ে বলছি, বাকি সব জেলা হয়তো কোনটা খাবারের জন্য বিখ্যাত, কোন জেলা আবার তার ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত কিন্তু নোয়াখালী জেলা তার ভাষার জন্য বিখ্যাত।
মানে সব জেলা থেকে নোয়াখালীর ইতিহাস বা নোয়াখালীর ভাষা সব কিছুই যেন আলাদা। এখানকার মানুষের একটি নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ভাষা রয়েছে। নোয়াখালীর ভাষাই এখানকার সবচেয়ে আকর্ষনীয় বা অবাক করা বিষয়।
আপনারা হঠাৎ করে কোন নোয়াখালী মানুষের কথা শুনলে বুঝতেই পারবেন না, তারা কি বলছে। এই ভাষার জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি সারা দেশ জুড়েই রয়েছে। এমনকি এই জেলার ভাষা নিয়ে বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালও বানানো হয়েছে।
নোয়াখালী জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?
ড্রিম ওয়ার্ল্ড পার্ক
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদম দক্ষিণে ধর্মপুর গ্রামে দৃষ্টিনন্দন গাছগাছালি পরিবেষ্টিত আনুমানিক ২৫ একর জায়গাজুড়ে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে ড্রিম ওয়ার্ল্ড পার্ক। এখানে প্রতিবছর শিশুসহ সব বয়সী বিনোদন পিপাসু মানুষেরা ঘুরতে আসে।
মুছাপুর ক্লোজার
মুছাপুর ক্লোজারটি প্রথম দেখলে মনে হবে সৈকত। কিন্তু খানিক পরে ভ্রম কাটবে। এখানে খুঁজে পাবেন নদীপাড়ে সাগরের আবহ।
এটি নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর গ্রামে অবস্থিত। মুছাপুর ক্লোজার ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য মনমাতানো একটি পর্যটন জায়গা।
নিঝুম দ্বীপ
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার দক্ষিণ পশ্চিমে বঙ্গপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা ছোট্ট একটি ভূ-খন্ডের নাম নিঝুম দ্বীপ। এটি নোয়াখালী জেলার একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
বজরা শাহী মসজিদ
নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঠিক পাশেই অবস্থিত বজরা শাহী মসজিদ।
দিল্লির শাহী জামে মসজিদের অনুকরণে নির্মিত হয় এই মসজিদ। এটি দেখতে অনেকটাই সুন্দর এবং এখানকার পরিবেশ ও অনেকটাই মনোরম।
নোয়াখালী জেলার বিখ্যাত খাবার?
খোলাজা পিঠা (খোলাজালি)
খোলাজালি পিঠা বা খোলাজা পিঠা মূলত চালের গুঁড়ার তৈরি একটি বাঙালি ঐতিহ্যবাহী পিঠা। এই পিঠা নোয়াখালীতেই জন্ম এবং নোয়াখালী জেলা থেকেই এর পরিচিতি ছড়িয়েছে সারা বাংলাদেশে।
খাইস্যা বা খাইস্যরা
সিমের বিচি দিয়ে তরকারি দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই খাওয়া হয়। নোয়াখালীতে সিমের বিচি এবং চিংড়ি মাছ এই দু’টি একসঙ্গে করে রান্না করা তরকারিকে আঞ্চলিক ভাষায় খাইস্যরা বলে। সিমের সিজনে এই তরকারি নোয়াখালীর প্রতি ঘরেই কম বেশি রান্না করা হয়ে থাকে।
কলা পাতায় মরিচ খোলা বা পাতুরি
নোয়াখালীর সবথেকে জনপ্রিয় ও প্রাচীন ঐতিহাসিক একটি খাবার হচ্ছে মরিচ খোলা। এই অঞ্চলে অতিথি আপ্যায়নে সব আইটেমের পাশাপাশি মরিচ খোলা থাকবেই।
মরিচ খোলা মূলত কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে ছোট মাছ বা পাঁচমিশালী মাছ রান্নার বিশেষ এক পদ্ধতি। যার নাম আদিকাল থেকে সবাই মরিচ খোলা বলে আসছে।
নারিকেল পুলি পিঠা
নোয়াখালী জেলার আরেক ঐতিহ্যবাহী পিঠা হচ্ছে নারিকেল পুলি পিঠা। বিশেষ করে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বা বিশেষ কোন মেহমান আপ্যায়নে এই পিঠা পরিবেশন অনেকটাই বাধ্যতামূলক হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
এই পিঠা গরমে খেতে অনেকটাই মজা লাগে তাই বাড়িতে এই পিঠা বানানোর আয়োজন করলে সবাই গরমে খাওয়া জন্য কেউ বাড়ি ছেরে কোথাও যায় না।
সাইন্না পিঠা (ম্যারা পিঠা)
আমাদের দেশের সব অঞ্চলেই শীতের সময় তৈরি করা হয় নানান রকমের পিঠা। এর থেকে ব্যতিক্রম নোয়াখালী জেলাও, এখানেও শীতকালীন জনপ্রিয় এক পিঠার নাম হচ্ছে সাইন্না পিঠা। বিভিন্ন জেলায় এই পিঠা ম্যারা পিঠা নামেও পরিচিত।
নোয়াখালী জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
এটিএম শামসুজ্জামান
এটিএম শামসুজ্জামানকে দেশের এক অন্যতম সম্পদও বলা যেতে পারে। কারণ তার কর্ম জীবন এর ইতিহাস বলে শেষ করা যাবে না। তিনি বাংলাদেশি অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, কাহিনীকার, সংলাপকার ও গল্পকার।
জহির রায়হান
তিনি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র পরিচালক, ঐপন্যাশিক এবং পাশাপাশি গল্পকার। তিনি ও এ দেশের একজন জ্ঞান ব্যক্তি এবং নোয়াখালীর বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন।
শহীদুল্লা কায়সার
তিনি বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক লেখক ও বুদ্ধিজীবী। তিনি শুধু নোয়াখালী নয় পুরো বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি।
আলী আহমদ
তিনি একজন ভাষা সৈনিক। এবং চৌমুহনী কলেজ ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক।
নোয়াখালী জেলার আয়তন কত?
নোয়াখালী জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৪২,০২,৭০ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৩৩,৭০,২৫১ জন।
নোয়াখালী জেলার উপজেলা কয়টি?
নোয়াখালী জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ৯টি। যেমনঃ
- নোয়াখালী সদর
- বেগমগঞ্জ
- সুবর্ণচর
- সেনবাগ
- সোনাইমুড়ি
- হাতিয়া
- চাটখালি
- কোম্পানীগঞ্জ
- কবিরহাট
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।
এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে কক্সবাজার কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
নোয়াখালী জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানে বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ।



