খুলনা কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি খুলনা জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।
তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা খুলনা জেলার সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
খুলনা জেলার ইতিহাস?
খুলনা জেলার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এই অঞ্চলটি প্রাচীনকালে গঙ্গো-বঙ্গ রাজ্যের অংশ ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে পর্তুগিজরা এই অঞ্চলে এসে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশরা বাংলার শাসনভার গ্রহণের পর এই অঞ্চলটি তাদের দখলে আসে।
এরপর ১৮৮২ সালে খুলনা জেলা গঠিত হয়। খুলনা জেলা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে দেশের বৃহত্তম কয়লা খনি, বৃহত্তম লৌহ-ইস্পাত কারখানা এবং বৃহত্তম পাটকল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবস্থিত।
খুলনা জেলার ভৌগোলিক অবস্থান?
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে খুলনা জেলা অন্যতম। এটি খুলনা বিভাগের অধিক্ষেত্রভূক্ত একটি জেলা। খুলনা জেলার উত্তরে যশোর ও নড়াইল জেলা, পূর্বে বাগেরহাট জেলা, পশ্চিমে সাতক্ষীরা জেলা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন অবস্থিত। খুলনা জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৪,৩৯৪.৪৫ বর্গ কিলোমিটার।
আরও পড়ুনঃ ফরিদপুর জেলার ইতিহাস | ফরিদপুর কিসের জন্য বিখ্যাত
খুলনা জেলার নামকরণ?
খুলনা জেলার নামকরণ নিয়ে বেশ কিছু মতভেদ রয়েছে। অনেকেই ধারণা করে, এই জেলার নামকরণ করা হয়েছে খুলনা নদীর নামানুসারে। খুলনা নদীর অর্থ হলো খোলা নদী। আরেকটি সূত্রে থেকে জানা গেছে এই জেলার নামকরণ করা হয়েছে খুলনা গ্রাম থেকে। খুলনা গ্রামটি এই জেলার সদর শহর খুলনার কাছে অবস্থিত।
খুলনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
খুলনা জেলা সুমিষ্ট সন্দেশ, গলদা চিংড়ি, বিশাল বিশাল নারকেল গাছ এবং ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবনের জন্য বিখ্যাত। এ জেলায় সুন্দরবন ছাড়াও আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। যেগুলোতে হাজার হাজার পর্যটক প্রতিদিনই ভিড় জমায়। তাহলে চলুন আমরা সেসব দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জেনে আসি।
খুলনা জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের সমাধি
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার সমাধি খুলনা জেলার রূপসা উপজেলায় অবস্থিত। এখানে গেলেই মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে।
সুন্দরবন
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন খুলনা জেলার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। খুলনা জেলার এই সুন্দরবন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণী এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। সুন্দরবনে দুবলার চর, কটকা, করমজল, হিরণ পয়েন্ট ইত্যাদি জনপ্রিয় পর্যটন স্পট রয়েছে।
খান জাহান আলী সেতু
এটি খুলনা শহরকে রূপসা নদীর দুই তীরে সংযুক্ত করছে। সেতুটি এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি খুলনা জেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে অবস্থিত। বাড়িটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে জড়িত অনেক স্মৃতি রয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর
খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর খুলনা শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। জাদুঘরটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পূর্বের নানান নিদর্শনগুলোর একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ রাজবাড়ী জেলার ইতিহাস | রাজবাড়ী কিসের জন্য বিখ্যাত
খুলনা জেলার বিখ্যাত খাবার?
কাচ্চি বিরানি
কাচ্চি বিরানি হচ্ছে খুলনার আরেকটি বিখ্যাত খাবার। খুলনার কাচ্চি বিরানি মুুলত আলু দিয়ে তৈরি করা হয়। খুলনা জেলার নবাবী কাচ্চি, তুরাগ কাচ্চি, মেগার কাচ্চির মতো রেস্তোরাঁগুলোতে এই কাচ্চি বিরানি পাওয়া যায়।
চুই ঝালের খাসি
চুইঝালের খাসি হচ্ছে খুলনার সবচেয়ে বিখ্যাত খাবারগুলোর মধ্যে একটি। এই চুইঝাল মূলত এক ধরণের ঝাল মশলা। যা মাংসের স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। খুলনার মুসলিম হোটেল, আব্বাস হোটেল, জিরো পয়েন্টের মতো রেস্তোরাঁগুলোতে এই চুইঝালের খাসি পাওয়া যায়।
নারকেল
এটি খুলনা জেলার একটি জনপ্রিয় খাবার। গরমের সময় তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য অনেক উপকারী এই নারকেল। সমুদ্র সৈকতে ঘুড়ার সময় অনেকেই এই নারকেল খেয়ে থাকে। এটি এখানে উচ্চ ফলনশীল বলে একে খুলনার বিখ্যাত খাবার বলা হয়।
রসগোল্লা
খুলনা জেলার একটি বিখ্যাত খাবার হলো রসগোল্লা। খুলনার এই রসগোল্লা অত্যন্ত সুস্বাদু হয়ে থাকে। আপনারা খুলনার যেকোন মিষ্টির দোকানে এই রসগোল্লা পেয়ে যাবেন।
সেমাই পিঠা
সেমাই পিঠা হচ্ছে খুলনার অন্যতম একটি বিখ্যাত খাবার। এই জনপ্রিয় খাবারটি মূলত চালের গুঁড়া, ঘি এবং চিনি ব্যবহার তৈরি করা হয়। আপনার যদি যখন খুলনায় ভ্রমণ করেন। তাহলে অবশ্যই এই খাবারটি একবার হলেও খেয়ে দেখবেন।
খুলনা জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
এনামুল হক
এনামুল হক হলেন একজন বাংলাদেশী ক্রিকেটার। তিনি বাংলাদেশের একজন অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেটার। তিনি ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায়
তিনি একজন প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, শিক্ষক, দার্শনিক ও কবি ছিলেন। তিনি ইতিহাসের অন্যতম ব্যক্তিত্ব বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসুর সহকর্মী ছিলেন। তিনি ভারতের প্রথম শিল্প প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কেমিক্যালসের প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কারি (I) নাইট্রেটের আবিষ্কারক ছিলেন।
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত একজন প্রখ্যাত বাঙালি নাট্যকার ও সাংবাদিক ছিলেন। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের নাটকগুলো দেশাত্মবোধ এবং সমাজ সচেতনতার দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য। তার নাটকগুলোতে তিনি বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সামাজিক অনাচার ও অবিচারের চিত্র ফুটে তুলেছেন।
আশু মহণ শেখ
তিনি একজন ভূস্বামী, সমাজ সেবক, দানবীর, এবং ইসলাম প্রচারক ছিলেন। তিনি মসজিদ এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণে সহায়তা করেন।
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার
তিনি একজন স্বনামধন্য বাঙালি কবি ও পত্রিকা সম্পাদক ছিলেন। তিনি একাধারে, কবি, সমাজসেবক, সম্পাদক, ও শিক্ষাবিদ হিসেবে বাংলা সাহিত্যে ও সমাজজীবনে অসামান্য অবদান রাখেন।
আরও পড়ুনঃ রাঙ্গামাটি জেলার ইতিহাস | রাঙ্গামাটি কিসের জন্য বিখ্যাত
খুলনা জেলার আয়তন কত?
খুলনা জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৪,৩৯৪.৪৫ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ২৬,১৩,৩৮৫ জন।
খুলনা জেলার উপজেলা কয়টি?
খুলনা জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ৯টি। যেমনঃ
- খুলনা সদর
- ডুমুরিয়া
- ফুলতলা
- তেরখাদা
- রূপসা
- দিঘলিয়া
- বটিয়াঘাটা
- কয়রা
- পাইকগাছা
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।
এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পটুয়াখালী কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
খুলনা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানেই বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ



