কুমিল্লা কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি কুমিল্লা জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।
তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা কুমিল্লা জেলা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
কুমিল্লা জেলার ইতিহাস?
কুমিল্লা শব্দটি মূলত উক্ত অঞ্চলের আদিনাম কমলাঙ্ক এর ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত আঞ্চলিক অপভ্রংশ রূপ যার অর্থ হচ্ছে পদ্মফুলের দীঘি। বাংলার এই কুমিল্লা অঞ্চলটি একসময় প্রাচীন সমতট অঞ্চলের অধীনে ছিল।
পরবর্তী সময়ে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে যোগ দেয়। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে কুমিল্লা পুরো অঞ্চলটি হরিকেল অঞ্চলের রাজাদের অধীনে আসে এবং তখন তারা কুমিল্লা অঞ্চলটি শাসন করে।
অষ্টম শতাব্দীতে লালমাই ময়নামতি দেব বংশ এবং দশম থেকে একাদশ শতকের ঠিক মাঝামাঝি পর্যন্ত চন্দ্র বংশের শাসনাধীনে ছিল। ১৭৬৫ সালে এই কুমিল্লা অঞ্চলটি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে আসে।
এরপর ১৭৬৯ সালে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে কোম্পানী একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করে। তখন ঢাকা প্রদেশের অন্তর্গত ছিল কুমিল্লা।
কুমিল্লা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
কুমিল্লা আমাদের বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি উন্নয়নশীল জেলা। এ জেলার পাশেই রয়েছে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে থেকে উৎপত্তি হওয়া গোমতী নদী। বাংলার প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে কুমিল্লা ছিল অন্যতম।
আমাদের এই কুমিল্লা শহর একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী ছিল। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া জেলা শহরের ডুলিপাড়া এলাকায় রয়েছে কুমিল্লা বিমানবন্দর।
বিমানবন্দরের ঠিক সাথেই গড়ে উঠেছে কুমিল্লার ইকোনমিক জোন ইপিজেডসহ আরও বিভিন্ন শিল্প কারখানা। ফলে কুমিল্লা বিমানবন্দর এলাকা পরিনিত হয়েছে একটি ব্যবসায়িক বাণিজ্যিক শহরে।
কুমিল্লা শহর মূলত একটি বিভাগ কেন্দ্রীক শহর। এই জেলার আশেপাশের জেলাগুলো থেকে অনেক মানুষ কুমিল্লায় আসেন বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে।
এছাড়াও কুমিল্লা শহরের পাঁচ কিলোমিটার দূরে রয়েছে বিবির বাজার স্থলবন্দর। ডিজিটাল জনশুমারী ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী কুমিল্লা আয়তন এবং জনসংখ্যায় দেশের ১১তম মহানগর।
কুমিল্লা জেলার দর্শনীয় স্থান সমূহ?
শালবন বৌদ্ধ বিহার
আমাদের দেশের প্রাচীন সভ্যতার যে নিদর্শন গুলোর হয়েছে। তার মধ্যে একটি অন্যতম হচ্ছে শালবন বৌদ্ধ বিহার। এটি কুমিল্লার ময়নামতিতে খননকৃত সব প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে এই শালবন বিহারটি প্রধান।
কারণ এর অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাকিগুলোর থেকে একে আলাদা করে তুলেছে। কোটবাড়ি এলাকায় বার্ডের কাছে লালমাই পাহাড়ের মাঝামাঝি এলাকায় এ বিহারটির অবস্থান।
ধর্মসাগর
ধর্মসাগর বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার একটি বৃহত্তর মানবসৃষ্ট জলাশয়। যা তৎকালীন সময় আশাপাশের মানুষের জন্য খনন করা হয়েছে।
এটি থাকার কারণে আশাপাশের মানুষ কখনও পানির সংকটে পরতে হতো না। এই জলাধারটি ১৪৫৮ সালে তিপ্রা রাজ্যে রাজা ধর্ম মাণিক্য প্রথম খনন করেছিলেন বলে জানা যায়। ধর্মসাগরের মোট আয়তন হচ্ছে ২৩.১৮ একর।
ময়নামতি জাদুঘর
কুমিল্লার প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা এই ময়নামতি জাদুঘর। যার অবস্থান কুমিল্লা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে সালমানপুরে। এই জাদুঘরে গেলে আপনারা প্রাচীন অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পাবেন।
ইটাখোলা মুড়া
কোটবাড়ির এই স্থানটি আনুমানিক সপ্তম বা অষ্টম শতকে নির্মিত একটি বৌদ্ধ বিহার। প্রাচীনকাল থেকেই এখানে ইট পোড়ানো হয় বলে জায়গাটির নাম হয়েছে ইটাখোলা মুড়া।
ইটাখোলা মুড়ায় প্রবেশ করে এর উপরে উঠে গেলে চতুর্ভূজাকার ক্ষেত্রের মাঝে দেখা যায় বিহারের প্রধান মন্দিরটি।
কুমিল্লা জেলার বিখ্যাত খাবার?
কুমিল্লার রসমালাই
কোথাও রসমালাইয়ের নাম শুনলেই যেন মনে পড়ে কুমিল্লার রসমালাই এর কথা। সারাদেশে এই রসমালাই পাওয়া গেলেও কুমিল্লার মাতৃভান্ডারের রসমালাই বিখ্যাত।
এই রসমালাই যেমন টা দেখতে লোভনীয় ঠিক তেমন টাই এর স্বাদ। অর্থাৎ এই রসমালাই এমনি এমনি বিখ্যাত হয় নাই এর অনন্য স্বাদ একে সারাদেশের মানুষের কাছে বিখ্যাত করে তুলেছে।
পেড়া মিষ্টি
কুমিল্লায় গিয়েছেন আর পেড়া মিষ্টি খাওয়া হয়নি এরকম মানুষ মনে হয় পাওয়াই যাবে না। কুমিল্লার বিখ্যাত এই মিষ্টি প্রায় অধিকাংশ মানুষেই পছন্দ করে থাকেন।
দেখতে এবং খেতে আকর্ষনীয় এই মিষ্টির প্রতি কামড়ে পাওয়া যায় এক অনন্য স্বাদ। এ স্বাদ সারাজীবন মুখে লেগে থাকার মতো।
হাঁড়ি ভাত
মাটির হাঁড়িতে পকা এই ভাত কুমিল্লা জেলার একটি ঐতিহ্যবাহি খাবার। যা বিশেষ অবসর এবং বিভিন্ন উৎসবে পরিবেশন করা হয়ে থাকে।
এটি মূলত কুমিল্লার একটি ট্রেডিশনাল খাবার। এটি যুগ যুগ ধরে এভাবেই বিভিন্ন উৎসবে খাওয়া হয়ে থাকে।
কুমিল্লা জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
মিজানূর রহমান আজহারি
তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের একজন ইসলামি আলোচক। তার ইসলামি জ্ঞান, উলেম তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তিনি দেশ এবং দেশের বাহিরে বিভিন্ন ইসলামী জলসায় ওয়াজ করে মানুষকে দিনের পথে দাওয়াত করে আসছে। তিনি কুমিল্লার একজন বিখ্যাত ব্যক্তি এমনি তিনি আমাদের দেশেরও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী
তিনি রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ও বঙ্গীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। তিনি শুধু কুমিল্লা না আমাদের দেশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন।
আব্দুল মতিন খসরু
সাবেক আইন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডেন্ট সদস্য এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন।
আব্দুল খালেক
আব্দুল খালেক একজন বাংলাদেশী শিল্প নির্দেশক। তিনি ১৯৯৮৮ সালের চলচ্চিত্র আগমন এ শিল্প নির্দেশনায় অবদান রাখার জন্য শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক বিভাগে জাতীয় পুরস্কার ভূষিত হন।
কুমিল্লা জেলার আয়তন কত?
কুমিল্লা জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৩৩,৮৭,৩৩ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৫৩,৮৭,২৮৮ জন।
কুমিল্লা জেলার উপজেলা কয়টি?
কুমিল্লা জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ১৭টি। যেমনঃ
- আদর্শ সদর
- কুমিল্লা সদর
- চৌদ্দগ্রাম
- লাকসাম
- বরুড়া
- নাংগলকোট
- মুরাদনপুর
- দেবিদ্বার
- বুড়িচং
- ব্রাহ্মণপাড়া
- লালমাই
- মনোহরগঞ্জ
- চান্দিনা
- তিতাস
- দাউদকান্দি
- হোমনা
- মেঘনা
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।
এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে চট্টগ্রাম কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
কুমিল্লা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানে বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ



