দিনাজপুর জেলার ইতিহাস | দিনাজপুর কিসের জন্য বিখ্যাত

দিনাজপুর কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি দিনাজপুর জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।দিনাজপুর জেলাতবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি অত্যন্ত মনোযোগসহ পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা দিনাজপুর জেলা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার, দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

দিনাজপুর কিসের জন্য বিখ্যাত?

বাংলাদেশের অন্যতম এবং সমৃদ্ধ জেলা দিনাজপুর বিখ্যাত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সেখানে থাকা শত শত দর্শনীয় স্থান, বিখ্যাত সব খাবার, মানুষের সহজ সরলতা জেলাকে সারাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত হতে সহায়তা করেছে।

দিনাজপুর জেলার ইতিহাস?

দিনাজপুর জেলা মূলত বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ জেলা। উপজেলার সংখ্যানুসারে দিনাজপুর বাংলাদেশের একটি এ শ্রেণীভুক্ত জেলা। দিনাজপুর জেলা আয়তনে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার মধ্যে বৃহত্তম।

আয়তন ও জনসংখ্যা?

দিনাজপুর জেলাটির আয়তন ৩,৪৪৪ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দিনাজপুর জেলার মোট জনসংখ্যা ৩,৩১৫,২৩৮ জন।

যাদের মধ্যে ২০.০% শহর এলাকায় বসবাস করত। জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ৯৬৩ জন প্রতি কিমি ২। এর মধ্যে পুরুষ ১৬,৬০,৯৯৭ জন, মহিলা ১৬,৫৪,২৪১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ১৬২ জন।

ভৌগোলিক অবস্থান?

দিনাজপুর জেলার ভৌগোলিক অবস্থান ২৪°০০′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৫°৩৬′ উত্তর অক্ষাংশ। এবং ৮৮°০০′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৮৯°০০′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থান।

এ জেলার দক্ষিণে নীলফামারী জেলা, পশ্চিমে রংপুর ও পঞ্চগড় জেলা। উত্তরে ভারতের মালদহ ও জলপাইগুড়ি জেলা এবং পূর্বে ঠাকুরগাঁও ও বগুড়া জেলা অবস্থিত।

দিনাজপুরের বিখ্যাত খাবার?

দিনাজপুরের খাবার তার নিজস্ব অনন্য স্বাদের জন্য বেশ বিখ্যাত। দিনাজপুরের বিখ্যাত খাবার গুলোর মধ্যে রয়েছে। যেমনঃ

প্যালকা

প্যালকা হচ্ছে দিনাজপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার যা সাধারণত গ্রামাঞ্চলে বেশি রান্না হয়ে থাকে। প্যালকা তৈরি হয় মূলত বিভিন্ন ধরণের শাক দিয়ে। প্যালকা সাধারণত ভাত, রুটি বা পরোটার সাথে পরিবেশন করা হয়ে থাকে।

সিদল

সিদল হচ্ছে এক ধরণের ঐতিহ্যবাহী খাবার যা দিনাজপুরের নিজস্ব। সিদল তৈরি হয় মূলত ভেড়ার মাংস, পেঁয়াজ, মরিচ, জিরা, ধনেপাতা, গরম মশলা ইত্যাদি দিয়ে। সিদল সাধারণত ভাত, রুটি কিংবা পরোটার সাথে পরিবেশন করা হয়।

মহাজনি মিষ্টি পোলাও

মহাজনী মিষ্টি পোলাও হল দিনাজপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার যা মহাজনী সম্প্রদায়ের লোকেরা তৈরি করে থাকে।

মহাজনী মিষ্টি পোলাও তৈরি হয় চাল, ভেড়ার মাংস, পেঁয়াজ, মরিচ, জিরা, ধনেপাতা, গরম মশলা, চিনি, এলাচ, দারুচিনি, জায়ফল, জয়ত্রী ইত্যাদি দিয়ে। মহাজনী মিষ্টি পোলাও সাধারণত ভাত, রুটি বা পরোটার সাথে পরিবেশন করা হয় থাকে।

সিদল ভর্তা

সিদল ভর্তা হল সিদল দিয়ে তৈরি একটি জনপ্রিয় ভর্তা। সিদল ভর্তা তৈরি হয় সিদল, পেঁয়াজ, মরিচ, ধনেপাতা, জিরা, গরম মশলা ইত্যাদি দিয়ে। সিদল ভর্তা সাধারণত ভাত, রুটি বা পরোটার সাথে পরিবেশন করা হয়ে থাকে।

বুট বিরিয়ানি

বুট বিরিয়ানি হল জনপ্রিয় খাবার যা দিনাজপুরের নিজস্ব একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। বুট বিরিয়ানি তৈরি হয় বুট, ভেড়ার মাংস, পেঁয়াজ, মরিচ, জিরা, ধনেপাতা, গরম মশলা ইত্যাদি দিয়ে। বুট বিরিয়ানি সাধারণত ভাত, রুটি অথবা পরোটার সাথে পরিবেশন করা হয়ে থাকে।

পাপড়

দিনাজপুরের এই পাপড় পুরো বাংলাদেশে বিখ্যাত। দিনাজপুরের পাপড় তৈরি হয় বিশেষ এক পদ্ধতিতে। দিনাজপুরের পাপড়ের স্বাদ ও গুণমান অন্য পাপড়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে।

দিনাজপুরের দর্শনীয় স্থান?

দিনাজপুর জেলা বাংলাদেশের একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জেলা। জেলাটি তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, গর্বিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য বেশ বিখ্যাত। দিনাজপুরের বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

শাহ সুলতান আহমেদ খানের মাজার

শাহ মখদুম রুপোশের একজন শিষ্য ছিলেন শাহ সুলতান আহমেদ খান। তিনি ১৫শ শতাব্দীতে দিনাজপুরে আসেন এবং সে দিনাজপুরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মাজারটি দিনাজপুর শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।

শাহ মখদুম রুপোশের মাজার

দিনাজপুরের অন্যতম বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান হল শাহ মখদুম রুপোশের মাজার। তিনি একজন সুফি সাধক ছিলেন যিনি ১৪শ শতাব্দীতে দিনাজপুরে এসেছিলেন। তার মাজারটি দিনাজপুর শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।

শিশুপার্ক

দিনাজপুর শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শিশুপার্কটি একটি জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। এখানে শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরণের খেলার সরঞ্জাম রয়েছে।

কান্তজিউ মন্দির

কান্তজিউ মন্দির বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় স্থাপনা। এটি বাংলাদেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। কান্তজিউ মন্দিরটি দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং দিনাজপুর-তেতঁলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে অবস্থিত।

মন্দিরটি ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তার শেষ বয়সে নির্মাণ কাজ শুরু করেন।

রামসাগর

দিনাজপুরের অন্যতম বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান হচ্ছে রামসাগর। এটি একটি কৃত্রিম দিঘি যা পলাশী বিপ্লবের কিছু পূর্বে রাজা রামনাথ খনন করেছিলেন। রামসাগরের আয়তন হল প্রায় ৪৩৭,৪৯২ বর্গমিটার।

গোর এ শহীদ

দিনাজপুরের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান হল গোর এ শহীদ। এটি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে শহীদ হওয়া শহীদদের সমাধি।

মহারাজা দীঘি

দিনাজপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মহারাজা দীঘি একটি খুবই ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি ১৯শ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। মহারাজা দীঘির আয়তন হচ্ছে প্রায় ৩,০০০ বর্গমিটার।

এছাড়াও দিনাজপুরে অন্যান্য দর্শনীয় স্থান এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ স্বপ্নপুরী পিকনিক স্পট। কখনো, দিনাজপুরে গেলে অবশ্যই এই দর্শনীয় স্থানগুলো আপনারা ঘুরে দেখবেন।

দিনাজপুরের বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ?

হাজী মোহাম্মদ দানেশ, অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের কৃষক নেতা। তাঁর নামানুসারে হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলী তিনি ছিলেন, আমাদের বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, স্বাধীনতার সনদ পাঠক ও মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী।

এম আব্দুর রহিম তিনি ছিলেন, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংবিধান রচনাকারী ও সাবেক সংসদ সদস্য। তাঁর নামকে স্বরণীয় করতেই দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ এর নাম পরিবর্তন করে এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ করা হয়।

বিচারপতি এ. টি. এম. আফজাল তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ। এবং সেই সাথে ৮ ম প্রধান বিচারপতি। নিতুন কুন্ডু, বাংলাদেশি চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।

আবুল হাসান মাহমুদ আলী, তিনি ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী। দিনাজপুরের বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম অগ্রগণ্য। আব্দুল্লাহ আল কাফি, তিনি একজন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ, সাবেক সংসদ সদস্য, দিনাজপুর-১।

খালেদা জিয়া, আমাদের দেশের সাবেক এবং প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। ডা. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন, স্বনামধন্য ব্যক্তি, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত সমাজ সেবক ও একইসাথে দেশসেরা অর্থোপেডিক চিকিৎসক হচ্ছেন তিনি।

শহীদ ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান ১৯৭১ এ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। এ,এল,এম ফজলুর রহমান, তিনি একজন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ রাইফেলসের সাবেক মহাপরিচালক ছিলেন।

মনোরঞ্জন শীল গোপাল, তিনি হচ্ছেন, বাংলাদেশের দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য। ইকবালুর রহিম জনাব এম. আব্দুর রহিম এর পুত্র হল ইকবালুর রহিম তিনি বাংলাদেশের দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য। মিজানুর রহমান মানু, বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ।

শেষ কথা

বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে। এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে।

এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে রংপুর কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন। দিনাজপুর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষনে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন।

আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানে বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ।

Share Now

This website is mainly created to provide information about travel, travel packages, travel agencies, travel visas, travel Bangladesh, and your travel to Bangladesh. We will always try to give you accurate information.

Leave a Comment