হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস | হবিগঞ্জ কিসের জন্য বিখ্যাত

হবিগঞ্জ কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি হবিগঞ্জ জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।হবিগঞ্জ জেলাতবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা হবিগঞ্জ জেলার সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস?

১৮৬৭ সালে হবিগঞ্জ জেলাটিকে মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়াও প্রাচীনকালে এই জেলাটির অন্তর্ভুক্ত এলাকা প্রাচীনকালে কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল। আবার এ ওজানা গেছে মধ্যযুগে হবিগঞ্জ জেলাটি ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে ছিল।

তবে সর্বশেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৮৪ সালে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের সময়কালে মহাকুমা প্রথা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে হবিগঞ্জকে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

হবিগঞ্জ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান?

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে হবিগঞ্জ জেলা অন্যতম। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হচ্ছে হবিগঞ্জ।

হবিগঞ্জ জেলার পূর্বে মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পশ্চিমে ব্রাহ্মণ্যবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ জেলা এবং উত্তরে সুনামগঞ্জ জেলা অবস্থিত। হবিগঞ্জ জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ২,৬৩৬.৫৮ বর্গ কিলোমিটার।

হবিগঞ্জ জেলার নামকরণ?

হবিগঞ্জ জেলার আদিনাম ছিল হবিবগঞ্জ। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে সৈয়দ হেদায়েত উল্লাহর ছেলে সৈয়দ হবিব উল্লাহ: ঐতিহাসিক সুলতানসী হাবেলীর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ সুলতানের অধঃস্তন পুরুষ।

সৈয়দ হবিব উল্লাহ খোয়াই নদীর তীরে একটি গঞ্জ বা বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামানুসারে জায়গাটির নামকরণ করা হয় হবিবগঞ্জ। হবিবগঞ্জ কালের পরিক্রমায় হবিগঞ্জ হিসেবে পরিচিত পায়।

হবিগঞ্জ জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?

হবিগঞ্জ জেলা তার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এখানকার ঢেউ খেলানো নদী, বিস্তৃত চা-বাগান, ঝর্ণা, এবং ঘন বনানী এই জেলাকে বিখ্যাত করে তুলছে। তাহলে চলুন সেসব মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে জেনে আসি।

হবিগঞ্জ জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?

শংকরপাশা শাহী মসজিদ

শংকরপাশা শাহী মসজিদ বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি হবিগঞ্জ জেলার হুরগাঁও ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামে অবস্থিত। ধারণা করা হয় এটি পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়। এই মসজিদটি একটি বর্গাকার প্ল্যাটফর্মের উপর নির্মিত।

রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল হলো রেমা-কালেঙ্গা। এই বনাঞ্চলে রয়েছে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৬০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ১৮ প্রজাতির সরিসৃপ এবং ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ।

বিতঙ্গল আখড়া

বিতঙ্গল আখড়াটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শন। এটি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিতঙ্গল গ্রামে অবস্থিত।

জানা গেছে এই বিতঙ্গল আখড়াটি ষোড়শ শতাব্দীতে রামকৃষ্ণ গোস্বামী নামে এক বৈষ্ণব ধর্মগুরু প্রতিষ্ঠা করেন।

কমলারানীর সাগর দীঘি

কমলারাণীর সাগরদীঘি হবিগঞ্জ জেলার একটি বৃহদায়তনের জলাধার। এটি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায় অবস্থিত।

প্রায় ৬৬.০০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই দীঘিটি। আয়তনের দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলাধার হিসাবে স্বীকৃত।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। এই ঐতিহাসিক উদ্যানে রয়েছে বিভিন্ন জাতের পাখি, বন্যপ্রাণী, লেক, ঝর্ণা ইত্যাদি। এই উদ্যানটি দেখলে মনে হয় প্রকৃতির যেন জীবন্ত উপহার।

মহারত্ন জমিদার বাড়ি

হবিগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়িটি। পর্যটকদের খুবই আকৃষ্ট করে থাকে। কেননা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত এই জমিদার বাড়িটি অত্যন্ত সুন্দর ও কারুকার্যময়।

যা দেখলে যেকোন ভ্রমণ পিপাসু মানুষ মুগ্ধ হয়ে যাবে। এই জমিদার বাড়িটি বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর গ্রামে অবস্থিত।

আরও পড়ুনঃ চাঁদপুর জেলার ইতিহাস | চাঁদপুর কিসের জন্য বিখ্যাত

হবিগঞ্জ জেলার বিখ্যাত খাবার?

হবিগঞ্জের চা

হবিগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চা উৎপাদনকারী জেলা। কাজেই এ জেলার চা সারা বাংলাদেশ বিখ্যাত।

এখানকার চায়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটিতে একটি চমৎকার ও সুন্দর সুবাস রয়েছে। এছাড়াও হবিগঞ্জের চায়ের রঙ গাঢ় এবং স্বাদ খুবই মসৃণ হয়ে থাকে।

ছিকর

হবিগঞ্জ জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হচ্ছে ছিকর। এই খাবারটি চালের গুঁড়া বা আটা দিয়ে তৈরি করা হয়। এটি মূলত একটি মিষ্টি বা স্ন্যাকস জাতীয় খাবার। এতে আরও বেশ কিছু উপদান মেশানো হয়।

যেমনঃ নারিকেল, খেজুরের গুড় এবং বিভিন্ন মশলা মিশিয়ে এর স্বাদ দি’গুণ করা হয়। এবং সকালের নাস্তাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা হয়।

লাউয়াছড়ার মধু

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মধু খুবই বিখ্যাত। এটি স্থান ভাবে বিভিন্ন পন্থা মেনে খুবই সুন্দর করে সংগ্রহ করা হয়। এই মধু ১০০% পিওর হওয়ায় এর স্বাদ অতুলনীয়।

চুনারুঘাটের ইলিশ মাছ

চুনারুঘাট উপজেলার ইলিশ মাছ খুবই বিখ্যাত। বর্ষা মৌসুম এলেই এখানকার নদীগুলোতে অনেক বড় বড় ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। শুধু ইলিশ নয় এখানকার নদীগুলোতে বিভিন্ন জাতের সুস্বাদ মাছ পাওয়া যায়।

বানিয়াচংয়ের তেতুলের আচার

হবিগঞ্জ জেলার আরেকটি বিখ্যাত খাবার হচ্ছে তেতুলের আচার। এই আচারটি বানিয়াচং উপজেলার স্থান লোকের টাটকা তেঁতুল দিয়ে তৈরি করে। আহ্ কি যে স্বাদ এই আচারের এখানকার আচার সারা বাংলাদেশে বিখ্যাত।

আরও পড়ুনঃ সিরাজগঞ্জ জেলার ইতিহাস | সিরাজগঞ্জ কিসের জন্য বিখ্যাত

হবিগঞ্জ জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?

সৈয়দ সুলতান

তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের একজন অন্যতম কবি। তিনি হবিগঞ্জ জেলার হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি কত সালে মৃত্যুবরণ করেন তা জানা যায়নি।

এম এ রশীদ

এম এ রশিদ তিনি প্রথম বুয়েটের উপাচার্য। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রকৌশল বিষয়ে প্রথম পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

তিনি ১৬ জানুয়ারি ১৯১৯ সালে চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। এবং ৬ নভেম্বর ১৯৮১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

চিত্ত রঞ্জন দত্ত

তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। এছাড়াও তিনি মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। তিনি ১ জানুয়ারি ১৯২৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ২৫ আগস্ট ২০২০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

আফজাল চৌধুরী

তিনি বাংলা সাহিত্যের ষাট দশকের অন্যতম প্রধান কবি ছিলেন। তিনি ১০ মার্চ ১৯৪২ খাগাউড়া হবিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ৯ জানুয়ারি ২০০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

শেখ ভানু

শেখ ভানু বাংলাদেশের একজন বাউল গানের কবি। তার লেখা গানের সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি।

মিরজা আবদুল হাই

তিনি বাংলাদেশের একজন কথা সাহিত্যিক ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনি ১ ডিসেম্বর ১৯১৯ সালে আবেদা গ্রাম হবিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

আরও পড়ুনঃ বান্দরবান জেলার ইতিহাস | বান্দরবান কিসের জন্য বিখ্যাত

হবিগঞ্জ জেলার আয়তন কত?

হবিগঞ্জ জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ২,৬৩৬.৫৮ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ১৮,৩০,৫৫৮ জন।

হবিগঞ্জ জেলার উপজেলা কয়টি?

হবিগঞ্জ জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ৯টি। যেমনঃ

  • হবিগঞ্জ সদর
  • আজমিরীগঞ্জ
  • চুনাইঘাট
  • নবীগঞ্জ
  • বানিয়াচং
  • বহুবল
  • মাধবপুর
  • লাখাই
  • শায়েস্তাগঞ্জ

শেষ কথা

বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।

এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে সুনামগঞ্জ জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।

হবিগঞ্জ জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানেই বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ

Share Now

This website is mainly created to provide information about travel, travel packages, travel agencies, travel visas, travel Bangladesh, and your travel to Bangladesh. We will always try to give you accurate information.

Leave a Comment