সিলেট জেলার ইতিহাস | সিলেট কিসের জন্য বিখ্যাত

সিলেট কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি সিলেট জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন। তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন।সিলেট জেলাকেননা এই আর্টিকেলে আমরা সিলেট জেলার সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

সিলেট জেলার ইতিহাস?

বহু বছর আগের সেই ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে সিলেট কে একটি পৃথক অঞ্চলে পরিণত করা হয়। তবে বঙ্গভঙ্গের আগে সিলেট আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গ রদ করার মধ্য দিয়ে সিলেট পুনরায় আসামের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় আবার সিলেটকে আলাদা একটি জেলায় পরিণত করা হয়।

এবং পূর্ববঙ্গের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান। যদিও সে সময় একদল মানুষ সিলেটকে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে থাকাটাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। তবে সময়ের পরিক্রমায় এখন তা সম্পূর্ণ রুপে স্বাভাবিক।

সিলেট জেলার ভৌগোলিক অবস্থান?

বাংলাদেশে ৬৪টি জেলার মধ্যে সিলেট জেলা অন্যতম। এটি সিলেট বিভাগের অধিক্ষেত্রভূক্ত একটি জেলা। সিলেট জেলার পূর্বে ভারতের আসাম, উত্তরে ভারতের মেঘালয়, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা এবং দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা অবস্থিত। সিলেট জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৩,৪৯০.৪০ বর্গ কিলোমিটার।

সিলেট জেলার নামকরণ?

কথিত আছে সিলেট জেলায় এক ধনী ব্যক্তির বসবাস ছিল। যার কন্যার নাম ছিল শিলা। শিলা খুবই অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। যার ফলে শিলার পিতা খুবই মর্মাহত হন। এরপর শিলার স্মৃতি ধরে রাখতে তার পিতা এই অঞ্চলে একটি বাজার নির্মাণ করেন। যার নামকরণ করা হয় শিলার হাট।

পরবর্তীতে এই নাম কালের পরিক্রমায় শিলার হাট থেকে সিলেট হয়ে যায়। এছাড়াও অনেকের ধারণা যে, সিলেটি ভাষা থেকে সিলেট শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। ঠিক যেমনঃ বাংলা থেকে বাংলাদেশ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

সিলেট জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?

বনজ, খনিজ ও মৎস্য সম্পদ এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এ জেলা বিখ্যাত। এছাড়াও সিলেট জেলায় প্রচুর পরিমাণে কমলালেবু, চা এবং সাতকরা উৎপন্ন হয়।

মূলত এগুলোই সিলেট জেলাকে দেশ এবং দেশের বাহিরে পরিচিত লাভ করতে সাহায্য করছে। আমরা প্রথমেই জেনে নিবো সিলেট জেলার কিছু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে।

সিলেট জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?

দেশের অপরূপ পাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট জেলা। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই জেলায় রয়েছে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। সিলেট জেলায় এসব দর্শনীয় স্থানসমূহ পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে থাকে। নিচে সিলেট জেলার কিছু দর্শনীয় স্থানের নাম উল্লেখ করা হলঃ

জাফলং

জাফলং সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত একটি অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত দর্শনীয় স্থান। এটি পাহাড় ও নদীর সম্মিলনে অবস্থান করছে বলেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবই পচ্ছন্দের একটি দর্শনীয় স্থান।

বিছানাকান্দি

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় রুস্তমপুর ইউনিয়নে অত্যন্ত সৌন্দর্যমন্ডিত এই বিছানাকান্দি অবস্থিত। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যেন এখানেই সবটুকু বহিপ্রকাশ ঘটেছে।

রাতারগুল

সিলেটের জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আরেকটি জনপ্রিয় পর্যটক কেন্দ্র হচ্ছে রাতারগুল জলাবন। এটি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত।

এই রাতারগুল জলাবন তার সবুজের অপার সমারহ আপনাকে মুগ্ধ করবে। এখানে চারদিকে সবুজ গাছ এবং তার মধ্যে পানি আহ! অসাধারন একটি দৃশ্য।

লালাখাল

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় অত্যন্ত সৌন্দর্যময় এই লালাখাল নদী অবস্থিত। এই লালাখাল নদী সিলেট শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নদীর দু’পাশে রয়েছে পাহাড়ি ঘন সবুজ বন, ঝর্নার চলার গতি এবং শাড়ি শাড়ি বিভিন্ন ধরণের গাছ।

যা পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে থাকে। এছাড়াও লালাখাল নদীতে দেখা মিলে অসংখ্য নদীর বাঁক। এসব দেখার জন্য প্রতিদিন অনেক পর্যটক ভিড় জমায়।

মালনিছড়া চা বাগান

সিলেট জেলার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একদম কাছে মালনিছড়া চা বাগান অবস্থিত। এ চা বাগানের মোট আয়তন হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ একর। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলায় চা বাগান রয়েছে।

তার মধ্যে সিলেটের চা বাগান অন্যতম। সিলেটের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা এবং চা বাগানের সবুজের আবরন পর্যটকদের কাছে পচ্ছন্দের একটি দর্শনীয় স্থান।

তামাবিল

তামাবিল সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত। জাফলং থেকে মাত্র ৫২ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই আপনারা তামাবিল দেখতে পাবেন। তামাবিল থেকে ভারতের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখতে পাওয়া যায়। তামাবিল গেলে আপনারা দেখতে পাবেন পথের ধারে বিশাল পাহাড়, ঝর্না এবং স্বচ্ছ পানির লেক।

সিলেট জেলার বিখ্যাত খাবার?

সিলেট জেলায় যে শুধু দর্শনীয় স্থান রয়েছে এমনটা নয়। এ জেলায় রয়েছে নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার। এসব ঐতিহ্যবাহী খাবার পর্যটকদের কাছে খুবই পচ্ছন্দের।

প্রত্যেক জেলায় নির্দিষ্ট কোন না কোন বিখ্যাত খাবার রয়েছে। সিলেট জেলাও এর ব্যতিক্রম নয়। চলুন জেনে নেই সিলেট জেলার কিছু বিখ্যাত খাবার সম্পর্কে। যেমনঃ

হাঁস বাঁশ

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে খুবই সুস্বাদু একটি খাবার হচ্ছে হাঁশ বাঁশ। হাঁসের মাংসের সাথে বাঁশ কোরল কুচি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা এবং বিভিন্ন ধরণের মসলার গুড়ো দিয়ে এই খাবার তৈরি করা হয়। এই খাবারের প্রধান উপকরণ হচ্ছে হাঁসের মাংস এবং বাঁশ কোরল কুঁচি। আর তাই তো এই খাবারের নাম হাঁস বাঁশ

সাতকরা

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার হচ্ছে সাতকরা। সাতকরা মূলত একটি টক ও সুগন্ধি জাতীয় উপাদান এবং এর আকৃতি কমলালেবুর মতো। এই খাবারটি সাধারণত রান্নার স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আখনি

সিলেট জেলার আরেকটি বিখ্যাত খাবার হচ্ছে আখনি। এই খাবারটি সুগন্ধি চাল দিয়ে তৈরি করা হয়। চালের সাথে ঘি, গরম মসলা এবং মুরগির মাংস মিশিয়ে বিষেশভাবে রান্না করা হয়। এটি অনেকটাই বিরিয়ানির মতো করেই রান্না করা হয়।

কমলালেবু

আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করছি যে, সিলেটে প্রচুর পরিমাণে কমলা চাষ করা হয়। এখানকার কমলা রসালো এবং খেতে দারুন সুস্বাদু হয়ে থাকে।

সাত রং চা

সিলেটের সাত রঙ চা একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। এটি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় চা। সিলেট গেলেই চা প্রেমিদের পচ্ছন্দের শীর্ষে থাকে এই সাত রঙের সিলেটি চা।

সিলেট জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?

গোবিন্দ চন্দ্র দেব

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনবিদ্যার একজন অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ১ ফেব্রুয়ারী ১৯০৭ সালে বিয়ানীবাজার সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ২৬ এ মার্চ ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

অশোক বিজয় রাহা

তিনি একজন ভারতীয় বাঙালি কবি প্রাবন্ধিক এবং সমালোচক ছিলেন। এছাড়াও তিনি বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্র অধ্যাপক এর দায়িত্ব দীর্ঘদিন পালন করেন।

শিতালং শাহ

তিনি সিলেটের একজন খ্যাতনামা মরমী সাধক কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি শুধু সিলেট নয় পুরো বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। তার লেখা কবি সাহিত্য যে কোন পাঠক পরলে মুগ্ধ হয়ে যাবে।

যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য

তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন বিখ্যাত লেখক ও গবেষক ছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দিলওয়ার

তিনি বাংলাদেশের একজন অন্যতম প্রধান কবি ছিলেন। তিনি ১ জানুয়ারি ১৯৩৭ সালে দক্ষিণ সুরমা সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। এবং ১০ অক্টোবর ২০১৩ সালে সিলেটে মৃত্যুবরণ করেন।

সিলেট জেলার আয়তন কত?

সিলেট জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৩,৪৯০.৪০ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৩৮,৫৭,০৩৭ জন।

সিলেট জেলার উপজেলা কয়টি?

সিলেট জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ১৩টি। যেমনঃ

  • সিলেট সদর
  • ওসমানীনগর
  • কানাইঘাট
  • কোম্পানীগঞ্জ
  • বিশ্বনাথ
  • বিয়ানীবাজার
  • গোলাপগঞ্জ
  • গোয়াইনঘাট
  • জকিগঞ্জ
  • ফেঞ্চুগঞ্জ
  • জৈন্তাপুর
  • দক্ষিণ সুরমা
  • বালাগঞ্জ

শেষ কথা

বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে। এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে।

এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে গোপালগঞ্জ জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন। সিলেট জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন।

আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানেই বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ

Share Now

This website is mainly created to provide information about travel, travel packages, travel agencies, travel visas, travel Bangladesh, and your travel to Bangladesh. We will always try to give you accurate information.

Leave a Comment