যশোর জেলার নামকরণের ইতিহাস

বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে যশোর জেলার রয়েছে এক গৌরবময় অতীত। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যশোরের ইতিহাস যেমনঃ প্রাচীন রাজাদের বীরত্বগাথা, সুফি সাধকদের ধর্ম প্রচার, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেমনি এর নামকরণের পেছনেও রয়েছে এক বিশিষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি।যশোর জেলার নামকরণের ইতিহাস‘যশোর’ নামটির উৎপত্তি ও ইতিহাস বিভিন্ন মতামত ও কাহিনিতে ঘেরা। অনেকে মনে করেন, এই নামের পেছনে রয়েছে গৌড়রাজ্যের রাজা বিক্রমাদিত্য ও তার বংশধরদের অবদান।

আবার কেউ কেউ মনে করেন, ‘যশ’ (খ্যাতি) ও ‘উর’ (স্থান) শব্দের সংমিশ্রণে গঠিত হয়েছে ‘যশোর’। অর্থাৎ “খ্যাতির স্থান”। এই জেলার নামকরণের ইতিহাস যেমনঃ রোমাঞ্চকর, তেমনি তা আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক।

যশোর জেলার নামকরণের ইতিহাস?

নিচে যশোর জেলার নামকরণের ইতিহাস তুলে ধরা হলোঃ

নবাবী শাসনামল (১৭০৩–১৭৫৭ খ্রিঃ)

মুর্শিদকুলী খাঁর (১৭০৩–১৭২৬ খ্রিঃ) শাসনামলে যশোর জেলা শাসন করতেন রাজা সীতারাম রায়। যিনি উত্তর রাঢ় বংশীয় কায়স্থ ছিলেন। তার পিতা উদয়নারায়ণ ভূষণার ফৌজদারের অধীনে তহশিলদার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সীতারামের রাজধানী ছিল মহম্মদপুর। তিনি নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর প্রতি আনুগত্য অস্বীকার করলে, নবাব তার বিরুদ্ধে সেনা পাঠান।

যুদ্ধে সীতারাম পরাজিত হন এবং তার পতনের পর যশোর জেলা বিভক্ত হয়ে পড়ে নাটোর, চাঁচড়া ও নলডাঙ্গার জমিদাররা জেলার বিভিন্ন অংশ নিজেদের দখলে নেন।

যশোরের স্বাধীনতা ও প্রতাপাদিত্যের শাসন (১৫৭৪–১৬১১ খ্রিঃ)

ষোড়শ শতকের শেষভাগে গৌড়ের শাসক দাউদের একজন বিশ্বস্ত সহযোগী শ্রীহরি ১৫৭৪ সালে যশোরের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং “মহারাজ বিক্রমাদিত্য” উপাধি গ্রহণ করেন।

বিক্রমাদিত্যের রাজধানী ছিল ঈশ্বরপুর ও ত্রেকাটিয়া। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৫৮৩ খ্রিঃ। তার সহযোগী ও আত্মীয় বসন্ত রায় ছিলেন প্রকৃত শাসক, যিনি যশোরকে ধনসম্পদে সমৃদ্ধ করেন।

১৫৮৭ সালে বিক্রমাদিত্যের পুত্র প্রতাপাদিত্যকে রাজা হিসেবে ঘোষিত করা হয়। তার প্রকৃত নাম ছিল গোপীনাথ। সুন্দরবনের ধুমঘাট ছিল তার রাজধানী।

খাঁন জাহান আলী ও ইসলামী প্রভাব

১৪০০ খ্রিঃ-এ দিল্লির সম্রাট নাসির শাহ বা মাসুদ শাহ, সুফি দরবেশ খাঁন জাহান আলী (আসল নাম উলুখ খাঁন)-কে বাংলায় প্রেরণ করেন।

তিনি যশোরে ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং পয়গ্রাম কসবা তার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি একজন বিখ্যাত ইসলামী সাধক ও ধর্মপ্রচারক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

ব্রিটিশ শাসনামল (১৭৫৭–১৯৪৭ খ্রিঃ)

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজদের শাসন শুরু হয়। ১৭৬৫ সালে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নিকট থেকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে, ফলে যশোর কোম্পানির অধীনে চলে যায়।

প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলে শোষণ-নির্যাতন। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, কৃষক সংগ্রাম ও স্বদেশী আন্দোলনসহ নানা প্রতিরোধ গড়ে ওঠে যশোরে।

আরও পড়ুনঃ যশোর জেলার পোস্ট কোড

পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় (১৯৪৭–১৯৭১ খ্রিঃ)

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের ফলে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। যশোর পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব অংশকে অবহেলা ও শোষণের মাধ্যমে শাসন করে।

দেশ ভাগের সময় যশোর জেলার সীমানায় পরিবর্তন আসে, বনগ্রাম মহকুমা ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।১৯৭১ সালে মেজর জিয়া ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং যশোরসহ সমগ্র দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ ও যশোর জেলার পুনর্গঠন (১৯৭১–বর্তমান)

স্বাধীনতার পর যশোরের প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৬০ সালে মাগুরার মহম্মদপুর এবং নড়াইলের আলফাডাঙ্গা থানা ফরিদপুরের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে যশোর জেলার চারটি মহকুমাঃ

নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ ও যশোর সদরকে পৃথক জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এভাবেই যশোর জেলার গঠন ও পুনর্বিন্যাসের দীর্ঘ ইতিহাস রচিত হয় ১৫৭৪ থেকে ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

Share Now

This website is mainly created to provide information about travel, travel packages, travel agencies, travel visas, travel Bangladesh, and your travel to Bangladesh. We will always try to give you accurate information.

Leave a Comment