রাঙ্গামাটি জেলার ইতিহাস | রাঙ্গামাটি কিসের জন্য বিখ্যাত

রাঙ্গামাটি কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন। তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন।রাঙ্গামাটি জেলাকেননা এই আর্টিকেলে আমরা রাঙ্গামাটি জেলা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

রাঙ্গামাটি জেলার ইতিহাস?

রাঙ্গামাটি বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে এমন একটি জেলা। শুধুমাত্র এই জেলায় একই সাথে দুটি দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। এদের মধ্যে এটি হচ্ছে ভারত এবং অপরটি হচ্ছে মায়ানমার। এছাড়াও এই রাঙ্গামাটি জেলার নাম নিয়েও রয়েছে একটি দীর্ঘ ইতিহাস।

জেলাটি মূলত পূর্বে রিয়াং/রিয়াং কান্ট্রি নামে পরিচিত ছিল। এবং ততকালীন সময় এই অঞ্চলটি ত্রিপুরা ও আরাকানের রাজাদের জন্য একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। ১৫৬৬ সালে মুসলিম আক্রমণের পর এই গোটা অঞ্চলটি মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।

১৭৩৭ সালের দিকে শের মোস্তা খান, একজন আদিবাসী নেতা, ততকালীন মুঘলদের কাছে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে বিভিন্ন জাতিসত্তার অন্যান্য বসতিগুলোর সাথে চাকমা বসতি শুরু হয়।

১৮৬৯ সালের দিখে এই জেলার নামকরণ করা হয় রাঙ্গামাটি, যার অর্থ হচ্ছে চাকমা ভাষায়, গোলাপের শহর। সম্ভবত এই অঞ্চলটিতে ক্রমবর্ধমান চাকমা জনসংখ্যার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।

রাঙ্গামাটি জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?

রাঙ্গামাটি জেলা মূলত সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় জেলা হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য এবং এখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় ইবাদতখানা রয়েছে।

জেলাটি ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, লুসাই সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল। জেলার সরকারী ভাষা বাংলা হলেও এই জেলায় চাকমা, মারমা এবং লুসাই সহ আরও অন্যান্য কয়েকটি ভাষাও কথিত হয়। এ জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষি, বনায়ন এবং পর্যটনের উপর নির্ভরশীল।

জেলায় উৎপাদিত প্রধান ফসল হচ্ছে ধান, পাট এবং চা। এছাড়াও এ জেলায় কাঠ, কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাস সহ আরও বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক সম্পদের অস্তিত্ব রয়েছে।

রাঙ্গামাটি জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?

কাপ্তাই হ্রদ

কাপ্তাই হ্রদ হচ্ছে একটি মানবসৃষ্ট হ্রদ। ১৯৬২ সালে আমেরিকার অর্থায়নে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। আর এই বাঁধ নির্মাণ করার মাধ্যমে বিশাল এলাকার নিয়ে এই হ্রদটি সৃষ্টি হয়। এই হ্রদটি মাছ ধরা, বোটিং এবং সাঁতার কাটার জন্য দর্শনার্থীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

রাজবন বিহার

এটি মূলত একটি বৌদ্ধ বিহার যা রাঙ্গামাটি শহরকে উপেক্ষা করে একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। মঠটি বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটিও দেখতে অনেক সুন্দর।

পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

এটি মূলত বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সাঙ্গু নদীর তীরে অবস্থিত একটি সৌন্দর্যবৃষ্ঠিত বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এই অভয়ারণ্যটি বাঘ হাতি হরিণ ছাড়াও আরও বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল।

ঝুলন্ত সেতু

ঝুলন্ত সেতু এটি কর্ণফুলী নদীর উপরে বেশ সৌন্দর্যময় একটি সেতু। সেতুটি মূলত নদী এবং পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখায়। যা পর্যটকদের বিশেষভাবে আক্রোশন করে থাকে।

শুভলং জলপ্রপাত

জলপ্রপাতটি দেখতে অনেকটা সুন্দর, এখানে বিরতিহীন পানি পরতে থাকে এবং এই জলপ্রপাতের নিচে সাঁটার কাটার জন্য সুবিধাও রয়েছে। যারা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ভালবাসেন আমি বলবো তারা একবার হলেও এই জায়গাটা থেকে ঘুরে আসুন।

রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত খাবার?

মুরগির গুঁতাইয়া

রাঙ্গামাটি পাহাড়ি জেলা হওয়ার কারণে অন্যান্য জেলা থেকে এ জেলার খাবার ধরণ একটু ভিন্ন। রাঙ্গামাটি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হচ্ছে মুরগির গুঁতাইয়া। এটি এ জেলায় বেশ বিখ্যাত এবং এটি খেতেও অনেক সুস্বাদু হয়ে থাকে।

এঁচোড় নিরামিষ

রাঙ্গামাটি পাহাড়ি উপজাতি সহ সাধারণ মানুষের একটি প্রিয় খাবার হচ্ছে এঁচোড় নিরামিষ। কাঁচা কাঁঠালের তরকারিকে সাধারণত এঁচোড় বলা হয়ে থাকে। আমি জানি না, আপনার জেলায় এটিকে কি বলে, তবে এটি এক একটা জেলায় একেক নামে বলা হয়।

রাঙ্গামাটি জেলার এই খাবার অন্যান্য জেলা থেকে প্রতিবছর বেশি খাওয়া হয়, বিশেষ করে উপজাতিরা এগুলো বেশি পছন্দ করে থাকে।

হাঙর শুটকি

রাঙ্গামাটি সহ বাংলাদেশের বেশ কিছু উপকূলীয় ও পার্বত্য জেলায় হাঙর শুটকি খুবই জনপ্রিয়। কক্সবাজার সমুদ্রের বিভিন্ন বন্দর থেকে ধরা হাঙর মাছকে কেটে প্রসেসিং করে শুকন বাঁশের সাথে বেধে শুকোতে দেয়া হয়। মূলত মাছ শুকিয়ে এই বিখ্যাত হাঙর শুটকি তৈরি করা হয়।

বাঁশের কোড়ল

আপনারা হয়তো বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন পাহাড়িদের একটি জনপ্রিয় খাবার হচ্ছে বাঁশের কোড়ল। এর থেকে ব্যতিক্রম নয় রাঙ্গামাটি, এ জেলারও জনপ্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বাঁশের কোড়ল। এ জেলায় এটি সবথেকে জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার।

গুটি বেগুন

রাঙ্গামাটি জেলার পাহাড়ি উর্বর মাটিতে জন্মানো সাধারণ একটি সবজি গুটি বেগুন। এটি সমতল অঞ্চলের বেগুনের মতো হলেও এটির স্বাদ একটু বিভিন্ন। অন্যান্য বেগুন থেকে রাঙ্গামাটির এই বেগুন অনেক সুস্বাদু হয়ে থাকে, আর তাইতো এই বেগুন এত বিখ্যাত।

রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?

কামিনী মোহন দেওয়ান

তিনি ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি রাঙ্গামাটি জেলার একজন অন্যতম বিখ্যাত ব্যক্তি।

রূপনা চাকমা

রূপনা চাকমা একজন নারী ফুটবলার। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে একজন অন্যতম সদস্য। তিনি ২২ সালের সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণ জিতেছেন, এমনকি সেই টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকও হয়েছিলেন।

ঋতুপর্ণা চাকমা

ঋতুপর্ণা চাকমা একজন বাংলাদেশ নারী জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়। তিনি বাংলাদেশ নরী ফুটবল দলের বহু জয়ের কারণ হয়েছিলেন।

শোভা রানী ত্রিপুরা

তিনি বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত লেখক। তার লেখা রচনা, ছোটগল্প, উপন্যাস পাঠকদের অনেক ভালো লাগে। তিনি মূলত তার জীবন এবং বাস্তব মূখী গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান, ভদ্রতা, মূলবোদ তার রচনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলে

বিনয় কুমার চাকমা

তিনি প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তার হাত ধরে রাঙ্গামাটি জেলার অনেক অবকাঠামো গঠে উঠে।

সুবিমল দেওয়ান

সুবিমল দেওয়ান একজন রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি। তিনি অনেক সৎ সুচরিত্র ব্যক্তি ছিলেন, এমনি তিনি জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী সমাজকর্মী হিসেবে ভূষিত হন।

রাঙ্গামাটি জেলার আয়তন কত?

রাঙ্গামাটি জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৬,১১৬.১৩ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৬,২০,২১৪ জন।

রাঙ্গামাটি জেলার উপজেলা কয়টি?

রাঙ্গামাটি জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ১০টি। যেমনঃ

  • রাঙ্গামাটি সদর
  • কাপ্তাই
  • রাজস্থলী
  • বেলাইছড়ি
  • বরকল
  • লংগদু
  • কাউখালী
  • নানিয়ারচর
  • বাঘাইছড়ি
  • জুরাইছড়ি

শেষ কথা

বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে। এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে।

এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে খাগড়াছড়ি কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন। রাঙ্গামাটি জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন।

আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানে বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ

Share Now

This website is mainly created to provide information about travel, travel packages, travel agencies, travel visas, travel Bangladesh, and your travel to Bangladesh. We will always try to give you accurate information.

Leave a Comment