ঢাকা কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি ঢাকা জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন। তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন।
কেননা এই আর্টিকেলে আমরা ঢাকা জেলা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
ঢাকা জেলার ইতিহাস?
ঢাকা জেলা একটি ঐতিহাসিক জেলা, এই জেলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি বেশ পুরোনো। মোগল শাসন আমেলের আগে এটি বার ভূইয়াদের শাসনাধীন ছিল। এরপর ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর বার ভূইয়াদের আক্রমণ করে বসে।
এবং আক্রমণটি ছিল বেশ তীব্র এতে তারা পরাজিত হন। এবং সেখানে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইসলাম খান চিশতী। আর এসব হওয়ার পর ঢাকার নামকরণ করা হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর। এমনকি অনেক আগে থেকেই ঢাকাসহ আশেপাশের অত্র এলাকা বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
আর হ্যাঁ, আপনাদের জানিয়ে রাখা ভাল যে, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খান চিশতী ঢাকার প্রশাসনিক নাম জাহাঙ্গীরনগর করলেও এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ঢাকা নামেই প্রচলিত ছিল। এমনকি ততকালীন সময় এই অঞ্চলের নাম আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে ঢাকা নামেই পরিচিত হয়।
ঢাকার নামকরণ?
ততকালীন সময়ে রাজা বল্লাল সেন সেখানে ঢাকেশ্বরী মন্দির নামের একটি মন্দির গড়ে তোলে। ঢাকেশ্বর এর অর্থ ঢাকার ঈশ্বর। মূলত সেখান থেকে ঢাকা নামটির প্রচলন শুরু হয় বলে জানা যায়।
১৯৮২ সালের আগে এটি ইংরেজিতে Dacca নামে পরিচিত ছিল। তবে পরবর্তীতে এটি ইংরেজিতে dhaka হিসেবে লেখিত করা হয়।
ঢাকা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
বাংলাদেশের প্রাণ কেন্দ্র হচ্ছে ঢাকা। ঢাকার জামদানি শাড়ি, বেনারসী শাড়ি, বাকরখানি এবং বিরিয়ানি জন্য ঢাকা জেলা সারা বাংলাদেশে বিখ্যাত। এছাড়াও ঢাকা জেলা বিখ্যাত মূলত কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এবং ঢাকা জেলার বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানের জন্য বিখ্যাত।
বাংলাদেশের ব্যবসা বানিজ্য সবকিছুই ঢাকা কেন্দ্রীক হয়ে থাকে। এমনকি প্রতিটি জেলা থেকে বিভিন্ন মানুষ এসে এই ঢাকা শহরে বসবাস করে। এবং বিভিন্ন ব্যবসা বানিজ্য করে। ঢাকা শুধু বিখ্যাত নয় বাংলাদেশের উন্নত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহর শীর্ষ স্থানে রয়েছে।
তাই তো এই ঢাকা কিসের জন্য বিখ্যাত তা বলে শেষ করা যাবে না। ঢাকা বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু আমরা তো সবগুলো গুনে শেষ করতে পারবো না। তাই চলুন আমরা এমন কিছু বিখ্যাত স্থান সম্পর্কে জেনে আসি। যা গোটা বাংলাদেশের মানুষ সেসব স্থানে একবার হলেও ঘুরতে আসতে চায়।
ঢাকা জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ?
আমাদের ঢাকা জেলায় এত বিফল পরিমাণে দর্শনীয় স্থান রয়েছে যেগুলো আপনি একমাস ঘুরেও শেষ করতে পারবেন না। আমরা আগে এমন কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানবো। যা আন্তর্জাতিক মানের এবং এসব স্থান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ ঘুরতে আসে। প্রথমেই যেমনঃ
মিরপুর শেরে বাংলা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম
এই ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি ঢাকার মিরপুরের ৬ নং সেক্টরে অবস্থিত। এটি ২৬ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি আধুনিক স্টেডিয়াম। এই স্টেডিয়ামটি ২০০৬ সালে নির্মাণ করা হয়।
বাইতুল্লাহ মোকাররম
বাইতুল্লাহ মোকাররম মসজিদটি আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ। এটিতে একসঙ্গে ৩০,০০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। এটি মুসল্লি ধারণক্ষমতা অনুযায়ী এখন বিশ্বের ১০ম বৃহত্তর মসজিদ।
জাতীয় জাদুঘর
বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত একটি অন্যতম বিশ্ব মানের জাদুঘর। এই জাদুঘরটি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এবং ১৭ নভেম্বর ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে এটি জাতীয় জাদুঘর হিসেবে মর্যাদা পায়।
আহসান মঞ্জিল
আহসান মঞ্জিল ঢাকার ইসলামপুর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি পুরোনো স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ঢাকা শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত একটি বিশেষ জাদুঘর। যা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার স্মৃতি এবং স্বাধীনতার অন্যতম নামক শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণার্থে স্থাপন করা হয়েছে।
অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য
এটি মূলত স্বাধীন স্মৃতি জড়িত একটি ভাস্কর্য। এটির অপরাজেয় বাংলা নামকরণ করে ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অবস্থিত।
এগুলো ছাড়াও ঢাকা জেলায় আরও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে আমরা নিচে কিছু দর্শনীয় স্থানের নাম উল্লেখ করছি। যেমনঃ
- বাংলাদেশ বিজ্ঞান জাদুঘর
- বোটানিকাল গার্ডেন
- জাতীয় আর্কাইভ
- রাজউক
- ফ্যান্টাসি কিংডম
- মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি
- স্বাধীন বাংলা স্কয়ার
- খ্রিস্টান কবরস্থান
- হোটেল শেরাটন
- শাপলা চত্বর ফোয়ারা
- বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়াম
- হোটেল সোনারগাঁও
- লালবাগ কেল্লা
- কমলাপুর স্টেশন
- ঐতিহাসিক সরওয়ার্দী উদ্যান
- লোক শিল্প জাদুঘর
- গুলশান লেক
- ওসমানী উদ্যান
- গণভবন
- জাতীয় সংসদ ভবন
- জাতীয় স্মৃতিসৌধ
- কদম ফোয়ারা
- বিমানবন্দর রক্ষা বাঁধ
- আনন্দনগর পার্ক
- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
ঢাকা জেলার বিখ্যাত খাবার?
ঢাকা জেলায় এতো এতো ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক স্টাইলে বিভিন্ন দেশের মসলা যুক্ত খাবার রয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। ভজনসিকরাই প্রমাণ দিয়ে দেন যে ঢাকা জেলার খাবার কতটা বিখ্যাত।
এই জেলায় এমন কিছু বিখ্যাত খাবার রয়েছে যদি সেগুলোর নাম উল্লেখ করা না হয়, তবে রীতিমতো অন্যায় হবে। তাই আসুন সেসব খাবার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসি। যেমনঃ
চকবাজারের ইফতারির দোকান?
প্রতিবছর রমজান মাস এলেই চকবাজারের ব্যবসায়ীদের হাতের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। কারণ এটা হয়তো আমরা সকলেই জানি যে, রমজান মাস এলেই চকবাজারে প্রচুর ইফতারি বিক্রির ব্যবসায় শুরু হয়।
দেশের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গিয়েছে প্রতিবছর ঢাকার এই ইফতারি বাজারের মার্কেট ভলিউম প্রায় ১০০ কোটি টাকা। কি অবাক হলেন তো, এটাই সত্যি তাই তো ব্যবসায়ীরা এই রমজান মাসে ইফতারি তৈরি করতে হিমসিম খায়, সেসময় কাজের এত চাপে তাদের হাতের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছের মতো হয়ে যায়।
কাচ্চি ভাইয়ের কাচ্চি
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি সমগ্র ঢাকায় একচেটিয়া বিরানির ব্যবসায় করছে। কাচ্চি বিরিয়ানির স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো, এই বিরিয়ানির নাম শুনলে ভুজনসিকদের জিভেজল চলে আসে। কাচ্চি বিরিয়ানির রেস্টুরেন্টে ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়িদের আনাগোনা সব সময় লেগেই থাকে।
এটি দেশ এবং দেশের বাইরে ও বেশ পপুলার ও জনপ্রিয়, কোন পর্যটক আমাদের দেশে আসলে তারা একবার হলেও এই বিরিয়ানি খেয়ে দেখে, এই বিনিয়ানি সারাবিশ্বে পরিচিত এবং বিখ্যাত, তাই তো ক্রিকেটার থেকে দেশের জনপ্রিয় ব্যক্তিরাও এই কাচ্চি বিরিয়ানি পছন্দ করে থাকে।
হাজির বিরিয়ানি
মাত্র কয়েক বর্গফুট জায়গার মধ্যে গরে ওঠা বিরিয়ানির দোকানটি বর্তমানে দেশ এবং দেশের বাহিরও ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। এই বিরিয়ানি ঢাকার অন্যতম একটি বিখ্যাত খাবার, যা এর লোভনীয় স্বাদ ভজনসিকদের আকৃষ্ট করে থাকে।
নান্না বিরিয়ানি
হাজির বিরিয়ানির মতো এই নান্না বিরিয়ানিও দেশ জুড়ে সুনাম অর্জন করছে। কথিত রয়েছে যে, বেচারাম দেউরীর নন্নার বিরিয়ানি আর হাজির বিরিয়ানির ভক্তদের মধ্যে যদি কখনও তর্ক বিতর্ক লেগে যায়। তাহলে নির্ঘাত তৃতীয় বিশ্ব বিশ্বযুদ্ধ বেধে যেতে পারে।
মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প?
এটি ঢাকা শহরে বিহারী ক্যাম্প নামে পরিচিত। এখানকার গরম ও খাসির চাপ এবং বিরিয়ানি অন্তত সুস্বাদু ও মজাদার। এছাড়াও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার গুলোর মধ্যে যেমনঃ কাচ্চি বিরিয়ানি পুরি, মোরগ পোলাও, বিভিন্ন স্বাদের কাবাব ও বাকরখানি খুবই বিখ্যাত।
ইতিহাস ঐতিহ্য এবং বাহারি রঙ্গের খাবারের স্বাদ উপভোগ করতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে আসতে হবে ধুলোমাখা এই ঢাকা শহরে।
ঢাকা জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
ঢাকা জেলায় যতগুলো বিখ্যাত ব্যক্তি রয়েছে। তাদেন আমরা নাম আমরা বলে শেষ করতে পারবো না। মূলত এসব ব্যক্তিত্বের পরিচয় এর মাধ্যমে বোঝা যায়। ঢাকা জেলা আসলে কিসের জন্য বিখ্যাত।
শামসুর রহমান
শামসুর রহমান বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যর অন্যতম প্রদান কবি ছিলেন। তিনি শুধু ঢাকা নয় গোটা বাংলাদেশের একজন গর্ভীত কবি ছিলেন। তার লেখা প্রতিটি কবিতার ভিতরে ছিল জ্ঞানের ভান্ডার। তিনি কবিতার মাধ্যমে আমাদেরকে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহনশীলতা শিখিয়েছেন।
আজম খান
তিনি হলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত গায়ক ও বাংলাদেশের পপ সংগীতের অগ্রপথিক। তিনি তার সংগীতের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার শিখরে উঠেছেন।
নবাব সলিমুল্লাহ
তিনি ছিলেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নবাব আহসানুল্লাহ
উনিশ শতকে তিনি বাংলার প্রখ্যাত ধনকুব ও সমাজ সেবক ছিলেন। তিনি এগুলো ছাড়াও উর্দূ সাহিত্যিকও ছিলেন।
ঢাকা জেলার আয়তন কত?
ঢাকা জেলার মোট আয়তন হচ্ছে বর্গ ১৪,৬৩.৬০ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ২,৩২১৫১০৭ জন।
ঢাকা জেলার উপজেলা কয়টি?
ঢাকা জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ৫টি। যেমনঃ
- কেরানীগঞ্জ উপজেলা
- সাভার উপজেলা
- ধামরাই উপজেলা
- দোহার উপজেলা
- নবাবগঞ্জ উপজেলা
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।
এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে বান্দরবান কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
ঢাকা জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানে বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ



