নাটোর কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার কিন্তু জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি নাটোর জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।
তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা নাটোর জেলা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
নাটোর জেলার ইতিহাস?
রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক জেলা হচ্ছে নাটোর। এটি বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এই জেলা মূলত ‘ক শ্রেণির পৌরসভা দ্বারা শাসিত হয়।
এই জেলার ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যবাহী। আর এই কারণেই নাটোর জেলার ব্র্যান্ডিং নাম করণ করা হয়েছে রাজসিক নাটোর।
নাটোর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
নাটোর কিসের জন্য বিখ্যাত এই প্রশ্ন আসলে সবার প্রথমে যেটি মাথায় আসে। সেটি হচ্ছে নাটোর জেলা কাঁচাগোল্লা, বনলতা আর অর্ধ বঙ্গেশ্বরী রানী ভবানীর কথা।
আমাদের দেশের একদম উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে এই জেলাটি অবস্থিত। নাটোর রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা শহর। নাটোর আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের ৩৬ তম জেলা।
বিভিন্ন বহমান নদ-নদী, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন, চলনবিল, উত্তরা গণভবন ইত্যাদির জন্য সুপরিচিত এই নাটোর।
নাটোর জেলার দর্শনীয় স্থান সমুহ?
বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত নাটোর জেলাটি রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত। এই জেলাটিতে প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপন এবং নানান ধরণের প্রতিকৃতি সাজা দর্শরীয় স্থান যেগুলো নাটোরকে এক অনন্য রুপ দিয়েছে।
নাটোর জেলার জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান গুলো যেমন নাটোর রাজবাড়ী, চলনবিল জাদুঘর, চলন বিল, দয়ারামপুর জমিদার বাড়ি, লালপুরের পদ্মার চর, ধরাইল জমিদার বাড়ি ও বুধপাড়া কালীমন্দির। নিচে নাটোর জেলার কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে উল্লেখ করা হলোঃ
হালতির বিল
নাটোর সদর থেকে দশ কিলোমিটার দূরে নলডাঙ্গা থানার অন্তর্গত হালতির বিল অবস্থিত। এই জেলার একটি অন্যতম মনোরম পরিবেশে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত হালতির বিল।
বিলটি নাটোর সদর উপজেলার পিপরুল, মাধনগর, খাজুরা ও ব্রহ্মপুর ইউনিয়ন জুড়ে বিস্তৃতি। আত্রাই নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছের প্রজননস্থল হিসেবে বিখ্যাত এই বিল।
চলন বিল
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিলের নাম হচ্ছে চলন বিল। এটি পাবনা, সিরাজগঞ্জ এবং নাটোর জেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট অনেকগুলো বিলের সমষ্টি মিলে চলন বিল তৈরি হয়েছে।
বর্ষায় দ্বীপের মত ভাসমান সবুজ গ্রাম, সুনীল আকাশ, শীতে অতিথি পাখির কলরব এবং শরতে বিলের পাড় ধরে ফোটে থাকা শত মত কাশবনের সৌন্দর্য আগত দর্শনার্থীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে থাকে।
গ্রীন ভ্যালী পার্ক
নাটোর জেলার লালপুর উপজেলা সদর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে গ্রীন ভ্যালী পার্ক অবস্থিত। এটি একটি খুবই চমৎকার বিনোদন কেন্দ্র।
প্রায় ১২৩ বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত গ্রীন ভ্যালী পার্কটিতে সকল বয়সী দর্শনার্থীদের চিত্তবিনোদনের জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইডের মধ্যে রয়েছে নাগরদোলা, ম্যারিগো রাউন্ড, হানি সুইং, পাইরেট শীপ, মিনি ট্রেন, বুলেট ট্রেন, স্পীডবোট, প্যাডেল বোট ইত্যাদি।
বুধপাড়া কালীমন্দির
নাটোর জেলায় লালপুর উপজেলার বুধপাড়ায় বুধপাড়া কালীমন্দির অবস্থিত। এই মন্দিরটি আনুমানিক ৫৩০ বছরের পুরনো একটি মন্দির। মন্দিরটি স্থাপনের সময়কালে এই উপমহাদেশে নবাবী শাসন আমল চলছিল।
এবং নবাব আলিবর্দি খানের আমলে বর্গীয় হাঙ্গামা শুরু হয়। বর্তমান ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের খাগড়া থেকে বর্গীদের অন্যায় অত্যাচার থেকে বাঁচতে ৬০ ঘর কংস বণিক নাটোরের বুধপাড়ায় এসে বসতি স্থাপন করেন।
তৎকালীন সময় তারা কালীপূজায় অর্চনার জন্য খড়ের ঘরের একটি মন্দির তৈরি করেন। যা এখন বুধপাড়া কালীমন্দির হিসেবে পরিচিত।
নাটোর জেলার বিখ্যাত খাবার?
কাঁচাগোল্লা ও বনলতার জন্য সারাদেশ জুড়ে বিখ্যাত এই নাটোর জেলা। দুই শত বছরের পুরনো এই জেলায় কাঁচাগোল্লা ছাড়াও আর অনেক পদের মিষ্টির উৎপত্তি হয়েছে।
শুধু মিষ্টি নয় বরং এই জেলার সাধারণ মানুষের হাতের স্পর্শে তৈরি করা প্রতিটি খাবারই নাটোরের রন্ধন শৈলীকে বেশ সমৃদ্ধ করেছে। নাটোরের বিখ্যাত মিষ্টি ও আঞ্চলিক বেশ কিছু খাবার নিচে উল্লেখ করা হলোঃ
নাটোরের কাঁচাগোল্লা
নাটোর কিসের জন্য বিখ্যাত এটি বলতে গেলে নাটোরের কাঁচাগোল্লা সবার আগে আসবে। মিষ্টি নাম শুনলে যেন সবাই নাটোরের কথা মুখে তুলে। অর্থাৎ কোথাও বিয়ে বাড়ি বা বিশেষ কোন অনুষ্ঠানে নাটোরের কাঁচাগোল্লা না হলে যেন চলেই না।
অনেকের আবার কাঁচাগোল্লার নাম শুনলে যেন নাটোর জেলার নাম মনে পরে যায়। এই মিষ্টির উৎপত্তি নাটোর জেলায় হলেও বর্তমানে বেশ কিছু জেলায় এই মিষ্টি তৈরি ও বিক্রি করা হয়ে থাকে।
অবাক সন্দেশ
বাংলাদেশের নাটোর জেলার একটি প্রখ্যাত মিষ্টান্ন হচ্ছে অবাক সন্দেশ। এই সুস্বাদু সন্দেশ শুধু নাটোর এবং এর পার্শ্ববর্তী কিছু জেলাতেই পাওয়া যায়। এই সন্দেশ দুধ, চিনি দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে।
ভাত তেলানি
এ অঞ্চলের মানুষের সাধারণ জীবন ধারার সাথে মিশে থাকা বিশেষ এক খাবার ভাত তেলানি। আগের দিনের বেঁচে যাওয়া ভাত ফেলে না দিয়ে ভাত তেলানি রান্না করা হয়ে থাকে। খেতেও হয় খুব সুস্বাদু আবার অপচয়ও রোধ করা সম্ভব হয়।
কুশালি
নাটোর জেলার আঞ্চলিক খাবারগুলোর মধ্যে সুস্বাদু এক পিঠা হচ্ছে কুশালি। মূলত দুধ পুলি পিঠাকে নোটোর অঞ্চলের মানুষ কুশালি বলে থাকে। মাঘের শীতে কখন বাঘ কাপে।
সেই প্রচন্ড ঠান্ডার সময় প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি করা হয় এই কুশালি পিঠা। যেটি খেতে দারুণ মজাদার মুখে লেগে থাকার মতো। ছোট থেকে বৃদ্ধ সবারই খুব পছন্দের খাবার নোটেরের এই পিঠা।
রাঘব শাহী
নাটোরের অন্যতম প্রাচীন একটি জনপ্রিয় মিষ্টান্ন হচ্ছে রাঘব শাহী। এটি অত্যান্ত মজাদার ও সুস্বাদু। রাঘবশাহী মিষ্টি এটি মূলত উন্নতমানের মানের দুধী মিষ্টি।
নাটোর ছাড়াও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলাতে এই মিষ্টি পাওয়া যেতে পারে। তবে নাটোরেই এই মিষ্টির উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ধুমার তরকারি
এ জেলার সাধারণ মানুষের অঞ্চলিক একটি খাবার হচ্ছে ধুমার তরকারি। ধুন্দল দিয়ে রান্না করা তরকারিকে মূলত ধুমার তরকারি বলা হয়ে থাকে।
আশরাফুল ইসলাম
আশরাফুল ইসলাম ছিলেন সিংড়া থানার আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও নাটোর মহকুমা আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি ১৯২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর নাটোরের সিংড়ার তাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
নাটোর জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
নাটোর জেলায় বাংলাদেশের অনেক কৃতি সন্তান জন্মেছেন। যারা নাটোরকে বিশ্বের দরবারে যেমন পরিচিত করেছেন, তেমনি বাংলাদেশকে নতুন করে পরিচিত করেছেন। তাদের মধ্যে নিচে কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হলোঃ
এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাশার
বাশার, এয়ার ভাইস মার্শাল মোহাম্মদ খাদেমুল ছিলেন বাংলাদেশের একজন সৎ সাহসী বিমানবাহিনী। তিনি বিমানবাহিনীর প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি ১৯৩৫ সালের এক সেপ্টেম্বর নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলাধীন ছাতারবাড়ীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
মহারানী ভবানী
মহারাণী ভবাণী ছিলেন ইংরেজ শাসনামলে এবং বর্তমান বাংলাদেশের নাটোরের একজন জমিদার। তিনি ১৭১৬ সালে বগুড়া জেলার তৎকালীন আদমদিঘী থানাধীন ছাতিয়ান নামক এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
নাটোর জেলার আয়তন কত?
নাটোর জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ১৮৯৬.০৫ বর্গ কিলোমিটার। এবং মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ১০,৫০,২৭৩ জন।
নাটোর জেলার উপজেলা কয়টি?
নাটোর জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ৭টি। যেমনঃ
- নাটোর সদর
- গুরুদাসপুর
- সিংড়া
- বড়াইগ্রাম
- লালপুর
- নলডাঙ্গা
- বাগাতিপাড়া
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।
এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে বগুড়া কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
নাটোর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানে বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ



