বগুড়া কিসের জন্য বিখ্যাত তা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী। আপনি যদি বগুড়া জেলার বিখ্যাত হওয়ার কারণ গুলো জেনে না থাকেন।
তবে দুশ্চিন্তা না করে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পডুন। কেননা এই আর্টিকেলে আমরা বগুড়া জেলা সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিখ্যাত খাবার ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
বগুড়া জেলার ইতিহাস?
করতোয়ার নদীর কূল ঘেঁষে বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি শহর হচ্ছে বগুড়া। উত্তরবঙ্গের রাজশাহী বিভাগে অবস্থিত বগুড়া জেলা একটি শিল্প ও বাণিজ্যিক নগর হিসাবে গড়ে উঠেছে।
বগুড়া কে বলা হয় উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার। অনেক সময় বগুড়াকে উত্তরবঙ্গের রাজধানী ও বলা হয়ে থাকে। বগুড়া জেলার প্রাচীন নাম হচ্ছে পুন্ড্রনগর। মৌর্যদের শাসনামলে এটি ছিল বাংলার রাজধানী।
বগুড়া জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত?
ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বগুড়া। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মৌর্য ,গুপ্ত থেকে শুরু করে পাল ও সেন বংশের রাজাদের প্রশাসনিক এলাকা ছিল এই বগুড়া জেলা। পরবর্তীকালে বগুড়া হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল।
অনেক ইতিহাস বই থেকে জানা যায়। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের দ্বিতীয় পুত্র সুলতান নাসির উদ্দিন বগরা খানের নাম অনুসারে এই অঞ্চলের নাম হয়েছে বগুড়া। তবে নামকরণের পিছনে এটি ছাড়াও আরও নানান কথা প্রচলিত রয়েছে।
অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই বগুড়া শহরে। ঐতিহাসিক সমৃদ্ধির কারণে ২০১৬ সালে সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে বগুড়ার মহাস্থানগড় কে নির্বাচন করেছিল। বগুড়া জেলা হিসেবে প্রথম গঠিত হয়েছিল ১৮২১ সাল।
তবে বগুড়া একটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় পরিণত হতে আরও ৩৮ বছর সময় লাগে। অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে এটা পূর্ণাঙ্গ জেলায় পরিণত হয়। এ সময়ের মাঝে বিভিন্ন এলাকা বগুড়া জেলার মাঝে সংযোজিত অথবা বিয়োজিত হয়েছে।
১৮৫৯ সালে ম্যাজিস্ট্রেট এবং কালেক্টরেট নিয়োগের মাধ্যমে বগুড়াকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এবং এর মধ্য দিয়ে বগুড়া একটি পূর্ণাঙ্গ জেলার রূপ পায়।
বগুড়া জেলার দর্শনীয় স্থান সমুহ?
ইতিহাস ঐতিহ্য ভরপুর বগুড়ায় দেখার মত অনেক গুলো বিখ্যাত জায়গা রয়েছে। বগুড়া জেলার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেমনঃ
মহাস্থানগড়
বগুড়া শহর থেকে প্রায় তেরো কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর তীরে শিবগঞ্জ উপজেলায় এই মহাস্থানগড় অবস্থিত। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা পুন্ড্র নামের এক প্রাচীন জনপদের রাজধানী ছিল মহাস্থানগড়।
খেরুয়া মসজিদ
বগুড়া শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে শেরপুর উপজেলায় দৃষ্টিনন্দন খেরুয়া মসজিদটি অবস্থিত। ১৫৮০ সালের নির্মিত মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন জওহর আলী কাকশালের পুত্র মির্জা মুরাদ শাহ কাকশাল।
প্রায় সাড়ে চারশ বছর পূর্বে এই মসজিদটি মুঘল ও সুলতানি আমলের স্থাপত্য শৈলীর আদলে বানানো হয়েছে।
মম ইন
বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস এর নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই মম ইন রিসোর্ট। বগুড়া শহর থেকে একটু দূরে মাটি ডালি নামক এলাকায় এটি অবস্থিত। মম ইন মূলত একটি পাঁচ তারকা হোটেল।
এটির ঠিক পাশেই রয়েছে লাগোয়া একটি ইকোপার্ক। ইকোপার্কের পাশাপাশি এখানে রয়েছে একটি ওয়াটার পার্ক। মূলত করতোয়া নদীকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত এই রিসোর্ট সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা।
বগুড়া জেলার বিখ্যাত খাবার?
বগুড়ার দই
বগুড়ার নাম শুনলেই সবার আগে যে জিনিসটার কথা মাথায় আসে সেটি হচ্ছে দই। দই হচ্ছে মূলত একটি দুগ্ধজাত খাবার। দই সারা বাংলাদেশেই কমবেশি পাওয়া যায়।
তবে বগুড়ার দই স্বাদে গুণে অনন্য। বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি ব্রিটিশ আমল থেকেই। শুধু দেশের গণ্ডিতেই নয় বিদেশেও জনপ্রিয় এই বগুড়ার দই।
মহাস্থানগড়ের কটকটি
দইয়ের পাশাপাশি বগুড়ার আরেকটি বিখ্যাত খাবার হচ্ছে কটকটি। কটকটির প্রধান উপাদান হল আটা। আটার সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের উপকরণ মিশিয়ে খামির তৈরি করে ছাঁচে কেটে নেওয়া হয়।
এরপর ঘি-ডালডা এবং ভোজ্য তেলে ভাজা হয়ে থাকে। ভাজা শেষে গুড়ের রসে ডুবিয়ে দিলেই তৈরি কটকটি। এরপর ঠান্ডা হলেই তা খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায়।
স্পন্জ মিষ্টি
বগুড়ার সাথে বিভিন্ন রকমের মিষ্টান্নের নাম যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। এরই মাঝে একটি বিশেষ মিষ্টি হচ্ছে স্পঞ্জ মিষ্টি। স্পঞ্জ মিষ্টি মূলত এক ধরণের রসগোল্লা।
বগুড়ার স্পন্জ মিষ্টি অন্য এলাকার রসগোল্লার তুলনায় অনেকটাই আলাদা হয়ে থাকে। খুবই নরম তুলতুলে রসে ভরপুর বলেই হয়তো এর নাম স্পঞ্জ মিষ্টি বলা হয়।
আলুর ঘাটি
বগুড়ার সাধারণ মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার হচ্ছে আলুর ঘাটি। শুধুমাত্র আলু দিয়েই রান্না করা যায় এই ভীষণ মজার পদটি।
বগুড়া জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি?
বগুড়া অঞ্চলে জন্মেছেন বাংলাদেশের অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী মানুষ। এদের মধ্যে রাজনীতিবিদ যেমন রয়েছেন। তেমনি রয়েছেন জাতীয় খেলোয়াড় হিসেবে। এরকম কিছু বিখ্যাত মানুষদের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ
মোহাম্মদ আলী
১৯৫৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব করা মোহাম্মদ আলী ১৯০৯ সালের বগুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।
জিয়াউর রহমান
১৯৩৬ সালে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলায় জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান ১ নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন।
এবং তিনি জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। এছাড়াও ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
গাজিউল হক
বিখ্যাত ভাষা সৈনিক গাজিউল হক জন্মগ্রহণ করেছেন এই বগুড়ার মাটিতেই। ভাষা সৈনিক ছাড়াও তার আরেকটি পরিচয় হচ্ছে তিনি একজন প্রখ্যাত আইনবিদ ছিলেন।
অপু বিশ্বাস
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র অভিনেত্রী অপু বিশ্বাস ১৯৮৯ সালে বগুড়া সদরে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৪ সালে চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী হিসাবে কাজ শুরু করেন।
মুশফিকুর রহিম
১৯৮৭ সালে বগুড়া সদরে জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের এক জনপ্রিয় ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশ জাতীয় দলের টেস্ট খেলায় তিনি অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি তিন ফরমেটে একজন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসাবে গড়ে উঠেন।
বগুড়া জেলার আয়তন কত?
বগুড়া বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা। বগুড়া জেলা রাজশাহী বিভাগে অবস্থিত। বগুড়ার উত্তরে গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট জেলা। দক্ষিণ দিখে সিরাজগঞ্জ জেলা।
পশ্চিমে নওগাঁ জেলা এবং পূর্বে যমুনা নদী ও জামালপুর জেলার অবস্থান। বগুড়া জেলার মোট আয়তন হচ্ছে ৬৯.৫৬ বর্গ কিলোমিটার অথবা ২৬.৮৬ বর্গমাইল। বগুড়া জেলার মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৪,০০,৯৫৯ জন।
বগুড়া জেলার উপজেলা কয়টি?
বগুড়া জেলায় মোট উপজেলা রয়েছে ১২। যেমনঃ
- বগুড়া সদর উপজেলা
- ধূনট উপজেলা
- সারিয়াকান্দি উপজেলা
- শিবগঞ্জ উপজেলা
- শেরপুর উপজেলা
- গাবতলি উপজেলা
- সোনাতলা উপজেলা
- কাহালু উপজেলা
- দুপচাচিয়া উপজেলা
- নন্দীগ্রাম উপজেলা
- শাজাহানপুর উপজেলা
- আদমদিঘি উপজেলা
শেষ কথা
বাংলাদেশ সৌন্দর্যের এক অপরূপ উদাহরণ। এখানে ৬৪ জেলার মধ্যে সৌন্দর্যের দিক থেকে কোন জেলা এগিয়ে আবার কোন জেলা তুলনামূলক কম জনপ্রিয় রয়েছে।
এসব কিন্তু নির্ভর করে ব্যক্তি মনের চাহিদা এবং সেই জেলার সার্বিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করতে বগুড়া কিসের জন্য বিখ্যাত এ সম্পর্কে পড়তে পারেন।
বগুড়া জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত তা হয়তো এতক্ষণে স্পষ্টরূপে বুঝে গেছেন। আপনাদের কোন প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্ট করে জানিয়ে দিবেন। সকলের সুস্বাস্থ্য কামণা করে আজকের মত এখানে বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ্ হাফেজ



